ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০০ জনেরও বেশি ভারতীয়কে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়োগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা সংখ্যায় সবথেকে বেশি। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক বেশকিছু জনকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও ৫০ জন এখনও আটকে পড়ে রয়েছেন। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে ২৬ জন ভারতীয় নিহত এবং ৭ জন নিখোঁজ।
সাংসদ সাকেত গোখলে এবং রণদীপ সিং সুরজেওয়ালার এক প্রশ্নের জবাবে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, ‘ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধে ২০০–র বেশি ভারতীয় আটকে পড়েছিল। এদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল। সরকারের প্রচেষ্টায় ১১৯ জনকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে এবং ৫০ জনকে দ্রুত মুক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’ রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত দুই ভারতীয় মৃতদেহ দিল্লি বিমানবন্দরে আসার পর এই তথ্য দেন ভারতের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী।
রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য ভারতের যুবকদের প্রলুব্ধ করত রাশিয়া। এরপরই তাদের যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে পাঠানো হত। এবছর সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয়দের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকার জন্য পুনরায় সতর্ক করে দিয়েছিল। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে কেন্দ্র জানিয়েছিল যে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে কমপক্ষে ১২ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন এবং আরও ১৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার জানিয়েছিল যে, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ৮ জন ভারতীয় নিহত হয়েছিলেন।
বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে যে, তারা ১০ জন মৃত ভারতীয় নাগরিকের মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে এবং আরও দুজনের দেহ রাশিয়াতেই দাহ করার ব্যবস্থা করেছে। মৃত বা নিখোঁজ ১৮ জন ভারতীয়র পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে যে, প্রয়োজনে ভ্রমণ নথিপত্র এবং বিমান টিকিটের সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তারা বিতাড়িত ভারতীয়দের দেশে ফিরতে সহায়তা করেছে। অনেকের পরিবারের সঙ্গে ডিএনএ শনাক্তকরণ করে এবং পরিচয় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে রাশিয়াতেই দাহ করার কিংবা এদেশে দেহ ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে দুই দেশেই এশীয় তরুণদের নিয়োগের প্রবণতা দেখা দেয়। উচ্চ বেতন এবং নানারকম সুযোগ–সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ করেছিল, যার মধ্যে ভারত থেকেও অনেকে ছিল। অনেকেই ছাত্র বা পর্যটন ভিসায় রাশিয়ায় ভ্রমণ করেছিলেন। রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য তাদের জোর করা হয়। প্রায়শই তাদের বেতন আটকে রাখা হয় এবং ফ্রন্টলাইন মোতায়েন থেকে পালানো প্রায় অসম্ভব বলে জানা গেছে।
কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ অপরাধে জড়িত ভারতীয়দের জেল খাটার অথবা ফ্রন্টলাইন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিকল্প দিয়েছিল। গুজরাটের মাজোতি সাহিল মহম্মদ হুসেন নামে এক ব্যক্তি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। তাঁকে শাস্তির পরিবর্তে সেনাবাহিনীতে যোগদান করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সেনাবিহিনীতেই যোগ দেন সাহিল। মাত্র তিন দিন ফ্রন্টলাইনে থাকার পর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে, পড়াশোনার ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়া সাহিল হুসেনকে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। যেহেতু তিনি কারাদণ্ড ভোগ করতে চাননি, তাই বিশেষ সামরিক অভিযানের অংশ হওয়ার জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনে জনবলের ঘাটতি, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের মতো রাজ্যের বেকার যুবকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল ছদ্মবেশী এজেন্টরা। সাম্প্রতিক নিহতদের মধ্যে রয়েছে রাজস্থানের ২২ বছর বয়সী অজয় গোদারা, যিনি ২০২৪ সালের নভেম্বরে ছাত্র ভিসায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। তাঁকে জোরপূর্বক নিয়োগ করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দোনেস্কের সেলিডোভে ড্রোন হামলায় মারা যান। জানুয়ারিতে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর সহায়তা পরিষেবায় নিযুক্ত কেরালার একজন ব্যক্তি মারা যান। একইভাবে উত্তরাখণ্ডের ৩০ বছর বয়সী রাকেশ কুমার মৌর্য, যিনি ২০২৫ সালের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, আগস্টের শেষের দিকে ডনবাসে নিহত হন।
ভারতের প্রত্যাবর্তনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেও নিহতদের পরিবারগুলি ন্যায়বিচার দাবি করছে। কেন্দ্র জানিয়েছে যে, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী থেকে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং দ্রুত প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জন্য তারা তৎপর রয়েছে। রাশিয়ায় ভারতীয় মিশনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় সাধন করছে মৃতদেহ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। ডিএনএ শনাক্তকরণও চলছে। শনাক্তকারীদের দেশে ফেরানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ভারতীয় নাগরিকদের সুস্থতা এবং দ্রুত প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার জন্য তারা রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে।