আবার অশান্ত বাংলাদেশ। উগ্রপন্থী ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠল গোটা দেশ। ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় আছড়ে পড়ল বিক্ষোভের ঢেউ। পুড়িয়ে দেওয়া হল শেখ মুজিবর রহমানের বাসভবন। আওয়ামী লীগের অফিসে ভাঙচুর, আগুন। বাদ গেল না দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের অফিসও। সাংবাদিকরা আটক। অবশেষে প্রশাসনের তৎপরতায় মুক্ত। বিক্ষোভকারীদের মুখে ভারত বিরোধী স্লোগান।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওসমান হাদি। ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে কানের কাছে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এরপর তাঁকে চিকিৎসার জন্য সোমবার সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসারত অবস্থায় শুক্রবার সিঙ্গাপুরেই মারা যান এই তরুণ ছাত্রনেতা। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘চিকিৎসকদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও হাদি আঘাতের কারণে মারা গেছেন।’
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ওসমান হাদি। তিনি ছাত্র প্রতিবাদী দল ইনকিলাব মঞ্চের একজন সিনিয়র নেতা ছিলেন এবং তীব্র ভারতবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত একজন মেরুকরণকারী ব্যক্তিত্ব।। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানী ঢাকায় প্রথমে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ শাহবাগে জড়ো হয়। স্লোগান দিতে দিতে এবং প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং জুলাইয়ের বিদ্রোহের মূল সংগঠক হাদিকে রক্ষা করতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে।
বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। তীব্র ক্ষোভের মধ্যে একদল বিক্ষোভকারী দেশের বৃহত্তম সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’র অফিস ভাঙচুর করে। বিক্ষোভকারীরা রাজশাহীতে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন এবং আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঢাকায় ‘দ্য ডেইলি স্টার’ সংবাদপত্রের অফিস ভবনেও হামলা চালায়। দুটি সংবাদপত্রের অফিসে অনেক সাংবাদিক আটকে পড়েন। বিক্ষোভকারীরা প্রথমে এই অফিসগুলিতে ভাঙচুর চালায় এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুটি সংবাদপত্রের অফিসের বাইরে সেনা এবং আধাসামরিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ভবনের বাইরে দমকলকর্মীরা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
চট্টগ্রাম, রাজশাহীতেও বিক্ষোব ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা চট্টগ্রামে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারের বাসভবনে সামনেও জড়ো হয় এবং ভবনটিতে পাথর ছোড়ে। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে খুলশী প্রাঙ্গণের বাইরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে হাদির হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিতে শুরু করে এবং আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিরোধী স্লোগান তোলে। বলে, ‘ভারতীয় আগ্রাসন ধ্বংস করো’, ‘যারা লীগ (আওয়ামী লীগ)–এর অন্তর্ভুক্ত তাদের ধরো এবং হত্যা করো’।
চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি নাগরিকদের আইন নিজের হাতে না তুলে নেওয়ার আবেদন জানান। ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের রেহাই দেওয়া হবে না। শরীফ ওসমান হাদিকে শহীদ হিসেবে বর্ণনা করে ইউনূস বলেন, ‘হাদি পরাজিত ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী শক্তির শত্রু ছিলেন। যারা তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার এবং বিপ্লবীদের মধ্যে ভয় সঞ্চার করার চেষ্টা করেছিল, আমরা আবার তাদের পরাজিত করব।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার রাতেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেই ভাষণে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুতে শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশের সব সরকারি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি–বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে শনিবার জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। একই সঙ্গে শুক্রবার বাদ জুমা দেশের প্রতিটি মসজিদে শহীদ ওসমান হাদির মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে।’