জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার ৮১তম অধিবেশনে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করেছেন তিনি। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে খলিলুর রহমান ৯৯টি এবং কাকুরিস ৯১টি ভোট পেয়েছেন। তিনটি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ৯৬ ভোট। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত বাজিমাত করেন খলিলুর রহমান।
খলিলুর রহমান জার্মানির প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন। বেয়ারবকের এক বছরের মেয়াদ সেপ্টেম্বরে শেষ হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি প্রতি বছর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র দ্বারা নির্বাচিত হন, যেখানে প্রতিটি দেশের একটা করে সমান ভোট থাকে। নবনির্বাচিত খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর দিনে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং এক বছরের জন্য এই পদে থাকবেন। এই সময়ে তিনি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সভাপতিত্ব, বিতর্ক পরিচালনা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা সহজতর করার দায়িত্ব পালন করবেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব আঞ্চলিক ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। এ বছর এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এই পদের দাবিদার ছিল। ৮১তম অধিবেশনের জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গোষ্ঠীকে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে মূলত বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস–সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও এর একটা উল্লেখযোগ্য বৈশ্বিক মর্যাদা রয়েছে। সাধারণ পরিষদ এমন একটি ফোরাম যেখানে ছোটবড় সব দেশ তাদের মতামত প্রকাশ করে এবং এটা প্রতি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নেতাদের বৃহত্তম সমাবেশ।
এটা বিশ্ব নেতাদের একমাত্র বার্ষিক সমাবেশেরও স্থান, যা প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ছোটবড় সব দেশ তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। এটা সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের বাজেট নিয়ন্ত্রণ করে, চুক্তি গ্রহণ করে, দারিদ্র্য থেকে শুরু করে দুর্নীতি পর্যন্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলা করে এবং এমন অসংখ্য প্রস্তাব পাস করে যা আইনত বাধ্যতামূলক না হলেও প্রায় সবসময়ই বিশ্বজনীন মতামতের প্রতিফলন ঘটায়।
নিজের ভাষণে খলিলুর রহমান বলেন, ৮১তম অধিবেশন এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে শুরু হতে চলেছে যখন জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা নানা ক্ষেত্রে পরীক্ষিত হচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাত মানবতার ওপর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে চলেছে, অন্যদিকে উন্নয়নের সাফল্যগুলোও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। তিনি অনেক জায়গায় মানবাধিকার ও স্বাধীনতার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মানবিক সহায়তার জন্য উপলব্ধ সম্পদ ও সুযোগ ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে।
নবনির্বাচিত সভাপতি জাতিসংঘের আর্থিক পরিস্থিতিকে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সংস্থাটি বর্তমানে আর্থিক চাপের সম্মুখীন এবং এই সমস্যা মোকাবেলায় সকল সদস্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। জাতিসংঘের বাজেটে অন্যতম বৃহত্তম অবদানকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির কাছে শত শত কোটি ডলার ঋণী, যা আর্থিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস খলিলুর রহমানকে তার বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘খলিলুর রহমানের ব্যাপক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা শুধু সাধারণ পরিষদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র জাতিসংঘের সাফল্য নিশ্চিত করবে।’ তিনি জাতিসংঘের সংস্কার কর্মসূচির প্রতি রহমানের অঙ্গীকারেরও প্রশংসা করেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। আমাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো এগিয়ে নিতে এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে আমি তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে আবির্ভূত খলিলুর রহমান এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নেতৃত্ব এবং বিশ্বের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার মাধ্যমে বিশ্ব মঞ্চে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেন। এর আগে খলিলুর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।