২৮ জুলাই তাঁর জন্মদিন। আর মাত্র ১১ দিন পৃথিবীতে কাটাতে পারলেই ৯০ বছর পূর্ণ করতেন স্যার গ্যারি সোবার্স। কিন্তু সে সুযোগ হল না। ৯০তম জন্মদিন পালন করার আগেই মারা গেলেন ক্রিকেট ইতিহাসের এই সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার। বার্ধক্যজনিত কারনেই তাঁর মৃত হয়েছে। স্যার গ্যারি সোবার্সের হাত ধরেই অন্য উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট। তাঁর মৃত্যুতে গোটা ক্রিকেট বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোজের সেন্ট মাইকেলে জন্ম স্যার গারফিল্ড সোবার্সের। ৫ বছর বয়সেই বাবাকে হারান। চরম দ্রারিদ্রতার সঙ্গে মা তাঁকে মানুষ করেন। তিনি ক্রিকেট বিশ্বে গ্যারি সোবার্স নামেই পরিচিত ছিলেন। ১৯৫২ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক হয়। তিনি ছিলেন বাঁহাতি ব্যাটার। বাঁহাতে মিডিয়াম পেস বোলিং করার পাশাপাশি মাঝে মাঝে স্পিন বোলিংও করতেন। ১৯৫৪ সালে টেস্ট অভিষেক স্যার গ্যারি সোবার্সের। এরপর টানা ২০ বছর ধরে দুরন্ত ব্যাটিং এবং অসাধারণ বোলিং দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করেন। ব্যাটিং–বোলিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। এই কারণেই তাঁকে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্যার গ্যারি সোবার্স ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্বও করেন। এই ৭ বছরেতিনি ৩৯টি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন সোবার্স। ৫৭.৭৮–র চিত্তাকর্ষক গড়ে ৮০৩২ রান করেন। টেস্টে তাঁর সেঞ্চুরির সংখ্যা ২৬টি, হাফ সেঞ্চুরি ৩০টি। দুরন্ত ফিল্ডিংয়ে তিনি টেস্টে ১০৯টি ক্যাচও তালুবন্দী করেন। তাঁর বোলিংয়ের হাতও ছিল অসাধারণ। ৯৩টি টেস্টে ৩৪ গড়ে ২৩৫টি উইকেট তুলে নেন স্যার গ্যারি সোবার্স। যার মধ্যে ৬ বার ৫ উইকেট নেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৩৮৩টি ম্যাচ খেলেছেন সোবার্স। ৫৪.৮৭ গড়ে ২৮৩১৪ রান করেছেন, যার মধ্যে ৮৬টি সেঞ্চুরি রয়েছে। প্রতম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১০৪৩টি উইকেট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে, এর মধ্যে ৩৬ বার ৫ উইকেট। যে কোনও ফরম্যাট মিলিয়ে এক ওভারে টানা ৬টি ছক্কা হাঁকানো তিনিই প্রথম ব্যাটার। তিনি কার্ডিফে এক কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে এই ঐতিহাসিক কীর্তিটি অর্জন করেন। তাঁর ব্যাটিং দক্ষতার কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে সোবার্সের গড় ছিল ৫৭.৭৮, যেখানে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তা ছিল ৫৪.৮৭।
সোবার্সের শ্রেষ্ঠত্বের অনেক উদাহরণ ও প্রতীক রয়েছে। কিন্তু তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানটি পেয়েছিলেন আইসিসি–র কাছ থেকে। আইসিসি যখন তাদের বার্ষিক পুরস্কার চালু করে, তখন ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার’–এর নামকরণ করা হয় সোবার্সের নামে। এটা এখন ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ নামে পরিচিত।
পেশাদার ক্রিকেটে ৬ বলে ৬টি ছক্কা হাঁকানো প্রথম ক্রিকেটার ছিলেন গ্যারি সোবার্স। কিন্তু যে হাতে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, সেই হাতেরই দুটি আঙুল তিনি নিজেই কেটে ফেলেছিলেন। গ্যারি সোবার্স প্রতিটি হাতে ৬টি করে আঙুল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরে তিনি একটা ছুরি দিয়ে নিজের অতিরিক্ত দুটি আঙুল কেটে ফেলেন। ৫ বছর বয়সেই বাবাকে হারান গ্যারি সোবার্স। তাঁর বাবা, শেমন্ট সোবার্স, একজন নাবিক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান হামলায় তাঁর জাহাজটি ডুবে যায় এবং এতে জাহাজের সকল নাবিক নিহত হন।
গ্যারি সোবার্সের বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মা তাঁকে লালন–পালন করেন। সোবার্সের আরও পাঁচজন ভাইবোন ছিল। সোবার্সের শৈশব কেটেছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। তা সত্ত্বেও, তিনি একজন কিংবদন্তি অলরাউন্ডার হয়ে ওঠেন। মাঠে মদ্যপানের কারণে গ্যারি সোবার্সও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। ১৯৭১ এবং ১৯৭৩ সালে, তিনি সারারাত পার্টি করার পরেও টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। ১৯৭৩ সালে, মধ্যাহ্নভোজের সময় শৌচাগারে মদ্যপান করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।