কয়েক মাস ধরে লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত পিছু হটল ইউক্রেন সেনাবাহিনী। পতন ঘটল গুরুত্বপূর্ণ শহর সিভেরস্কের। পূর্বাঞ্চলীয় শহর সিভেরস্ক থেকে নিজেদের সৈন্য সরিয়ে নিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ান সেনা ক্রমশ সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকায় পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছেন ইউক্রেনীয় সেনারা। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে যে, রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ের পর পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর সিভেরস্ক থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
মঙ্গলবার টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ বলেছেন, ‘রুশ সৈন্যদের জনবল এবং সরঞ্জামের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। তারা কঠিন আবহাওয়ার মধ্যে ছোট ইউনিট আক্রমণ পরিচালনা করে প্রতিরক্ষামূলক ইউক্রেনীয় সৈন্যদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করেছে। আমাদের সৈন্যদের জীবন এবং ইউনিট রক্ষার জন্য সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
জেনারেল স্টাফ আরও বলেন, ‘পিছু হটার নির্দেশ দেওয়ার আগেই রুশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সিভেরস্ক থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও রুশ সেনাকে সামনের দিকে অগ্রসর হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।’ মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেনের ডিপস্টেট সামরিক পর্যবেক্ষণ সাইট জানিয়েছে যে, রাশিয়ান বাহিনী সিভেরস্কের পাশাপাশি রাশিয়ার সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের সুমি অঞ্চলের একটা গ্রাম হ্রাবোভস্কে দখল করেছে।
রাশিয়ার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সের্গেই মেদভেদেভ ১১ ডিসেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বলেছিলেন যে, সৈন্যরা সিভেরস্ক দখল করেছে। এই অঞ্চলে সাম্প্রতিককালে তীব্র লড়াই চলছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা সেই সময়ে রাশিয়ার সেই দাবি অস্বীকার করেছিলেন। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী সেই সময় বলেছিল যে, প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে রাশিয়ান সৈন্যরা আক্রমণ চালিয়েছিল।
কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট নিউজ সাইট জানিয়েছে যে, সিভেরস্কের আয়তন অল্প হলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জনসংখ্যা ছিল ১০০০০। এখন মাত্র কয়েকশ বেসামরিক লোক রয়ে গেছে। এই ছোট শহরটি উত্তর দোনেস্কের প্রতিরক্ষার মূল চাবিকাঠি ছিল। কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আরও জানিয়েছে, শহরটি বৃহত্তর স্লোভিয়ানস্ক এবং ক্রামাটোরস্ক অঞ্চলগুলিকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল। এটি ছিল ইউক্রেনের তথাকথিত দুর্গ বলয়ের প্রধান ঘাঁটি, যা রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আগে দখল করতে পারেনি।
রাশিয়ার আঞ্চলিক দাবির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা তিনটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলের মধ্যে একটা ডোনেটস্ক, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনের নেতারা বলেছেন যে তারা মস্কোর আক্রমণের সময় তাদের দেশের দখলকৃত ভূখণ্ড মেনে নেবেন না। ডিসেম্বরের শুরুতে রাশিয়ান বাহিনী ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের আনুমানিক ১৯ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে, যার মধ্যে ক্রিমিয়াও রয়েছে। ২০১৪ সালে মস্কো ক্রিমিয়াকে নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এছাড়া পুরো লুহানস্ক অঞ্চল এবং ডোনেটস্কের ৮০ শতাংশেরও বেশি।
এছাড়া রাশিয়ান বাহিনী খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং খারকিভ, সুমি, মাইকোলাইভ এবং ডিনিপ্রোপেট্রোভস্ক অঞ্চলের ছোট ছোট অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক প্রথম পেশ করা ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে যে, আলোচনার মাধ্যমে ক্রিমিয়া, লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ককে রাশিয়ান রাশিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী দাবি করেছে, সোমবার রাশিয়া ৬৩৫টি ড্রোন ও ৩৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে ৬২১টিই আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে জাইতোমির অঞ্চলে এক শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। সেখানকার প্রধান ভিতালি বুনেচকো জানান, শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি। সেখানে হামলায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। এছাড়া কিয়েভ অঞ্চলে একটা বাড়িতে হামলায় ৭৬ বছর বয়সী এক নারী নিহত ও তিনজন আহত হন। পশ্চিম ইউক্রেনের খমেলনিতস্কি এলাকায় হামলায় মারা গেছেন ৭২ বছর বয়সী আরেকজন বৃদ্ধ। পশ্চিম ইউক্রেন লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হাত থেকে বাঁচতে পোল্যান্ডও তাদের যুদ্ধবিমানগুলোকে সতর্ক অবস্থায় মোতায়েন করেছিল।