আর্টেমিস ২ মিশনের অংশ হিসেবে ৪ জনকে চাঁদে পাঠাল ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সংক্ষেপে নাসা। বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে এই চারজন নভোচারী যাত্রা শুরু করেছেন। চাঁদের চারপাশে ১০ দিনের এটা একটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান। চীনের প্রথম মনুষ্যবাহী অবতরণের আগেই চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রয়াসকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর্টেমিস ২–এর নভোচারীরা মহাকাশের এমন সব জায়গায় ভ্রমণ করবেন যেখানে এর আগে মানুষ কখনও পৌঁছায়নি।
আর্টেমিস ২ হল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট এবং ওরিয়ন মহাকাশযানে নভোচারী বহনকারী প্রথম অভিযান। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া কোটি কোটি বিলিয়ন ডলারের একাধিক মিশনের একটা সিরিজ। তিন বছরের প্রশিক্ষণের পর চার সদস্যের দলটি নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে যাত্রা করেছে। এই মিশনের লক্ষ্য হল আগামী দশক এবং তার পরেও চাঁদে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত করা। নাসা জানিয়েছে যে, ওরিয়ন মহাকাশযানটি ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম নাসা চাঁদে মানুষ বহনকারী কোনও মহাকাশযান থেকে সংকেত পাচ্ছে।
আর্টেমিস ২–এর চারজন নভোচারীর মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন মহিলা। চাঁদে অভিযানকারী নাসার এই দলে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। এই নভোচারী দলটি ১০ দিনের অভিযানে চাঁদে অবতরণ না করেই পৃথিবীর উপগ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করবে।
প্রশ্ন হল, আর্টেমিস ২ কীভাবে চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করবে। আসলে পৃথিবীর কক্ষপথে সাড়ে তিন ঘণ্টা ওড়ার পর ক্রুদের গামড্রপ আকৃতির ওরিয়ন ক্যাপসুলটি স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের আপার স্টেজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এরপর নভোচারীরা মহাকাশযানটির ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ নেবেন এবং এর চালনা ও চালনক্ষমতা পরীক্ষা করবেন। নভোচারীরা ২৫ ঘণ্টা ধরে একটা উঁচু, উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করবেন এবং বিচ্ছিন্ন উপরের স্তরটিকে একটি নিকটবর্তী কৌশলের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করবেন। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পরিবর্তে শুধু দৃষ্টির ওপর নির্ভর করে, তারা ওরিয়নকে ওই স্তরটির ১০ মিটারের মধ্যে নিয়ে আসবেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু চললে, ওরিয়নের প্রধান ইঞ্জিন নভোচারীদের একটি ‘ফ্রি–রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ বা মুক্ত প্রত্যাবর্তন পথে চাঁদের দিকে চালিত করবে। এটা এমন একটা পথ, যা মহাকাশযানটিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষীয় টানকে কাজে লাগাবে। এই অভিযানটি নভোচারীদের পৃথিবী থেকে ২,৫২,০০০ মাইল (৪,০৬,০০০ কিমি) দূরে নিয়ে যাবে।
এই উৎক্ষেপণটি নাসার এসএলএস রকেটের জন্য একটা বড় মাইলফলক, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণাধীন ছিল। ৩০ তলা সমান উঁচু এই ব্যবস্থাটি মানুষকে নিরাপদে গভীর মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। নাসার এই মিশনটি মূলত ফেব্রুয়ারিতে উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত ছিল। বারবার বিঘ্ন ঘটায় মিশনটি বিলম্বিত হয়।
আর্টেমিস ২ অভিযানটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অ্যাপোলো যুগের পর এই প্রথম নভোচারীরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ছেড়ে মহাকাশের গভীরে যাত্রা করবেন, চাঁদকে প্রদক্ষিণ করবেন এবং ফিরে আসবেন। নভোচারী দলটি যখন চাঁদের দূরবর্তী অংশে পৌঁছাবে, তখন তারা পৃথিবী থেকে ৪৫০,০০০ কিলোমিটার দূরে থাকবেন। এর মাধ্যমে এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে দূরপাল্লার মানব মহাকাশযাত্রা, যা ৫০ বছর আগে স্থাপিত দূরত্বের রেকর্ডটি ভেঙে দেবে।