নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
সোমবার ঝটিকা ভারত সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক করলেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। পাশাপাশি দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এআই, পারমাণবিক শক্তি এবং বাণিজ্যে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের ওপরও আলোচনা হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত রাষ্ট্রীয় সফরে সোমবার ভারতে আসেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে আমিরশাহির প্রতিনিধি দলটিতে ছিলেন আবুধাবি ও দুবাইয়ের রাজপরিবারের সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা। যাদের মধ্যে ছিলেন দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিন মাকতুম।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভারত সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, যদিও এই সফর মাত্র তিন ঘন্টা স্থায়ী হয়েছিল, তবুও এই বৈঠকে কৌশলগত, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনার সময় উভয় দেশই সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দুই দেশ নিজেদের অভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে।
দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ২০২৮ সাল থেকে বার্ষিক ০.৫ মিলিয়ন টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড এবং অ্যাডনক গ্যাসের মধ্যে ১০ বছরের এলএনজি সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছে। এই চুক্তি আমিরশাহিকে ভারতের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীদের মধ্যে অন্যতম করে তুলেছে। দুই দেশই বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার মধ্যে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চাহিদা পূরণে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ক্রমবর্ধমান ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছে।
এছাড়া দুই দেশই বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছ। উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তিতে অংশীদারিত্ব অন্বেষণ করতে সম্মত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বৃহৎ পারমাণবিক চুল্লি এবং ক্ষুদ্র মডুলার চুল্লির উন্নয়ন এবং স্থাপনা। সহযোগিতার মধ্যে উন্নত চুল্লি ব্যবস্থা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং পারমাণবিক নিরাপত্তাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই চুক্তি পারমাণবিক শক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য নতুন পথ খুলে দেবে।
আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন প্রযুক্তিগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল দূতাবাস প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শেখ মোহাম্মদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের এআই ইমপ্যাক্ট সামিট আয়োজনের ব্যাপারে নিজের সমর্থন জানিয়েছেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। এছাড়া দ্ব্যর্থহীনভাবে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেছে, যার মধ্যে সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসবাদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং অর্থ পাচার মোকাবিলায় দুই দেশ ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দুই দেশ।
ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে একটা যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে মহাকাশ খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছে। যার মধ্যে উৎক্ষেপণ এবং উপগ্রহ তৈরি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষি সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি বলেন, ‘উভয় পক্ষই ভারত মার্ট, ভার্চুয়াল ট্রেড করিডোর এবং ভারত–আফ্রিকা SETU উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি চলমান প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করবে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ১৩টি কোম্পানি, ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ফার্স্ট আবু ধাবি ব্যাংক, গুজরাটের GIFT সিটিতে তাদের অফিস এবং কার্যক্রম খোলার অনুমতি পেয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উভয় পক্ষই আবু ধাবিতে একটা ‘হাউস অফ ইন্ডিয়া’ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা একটা অনন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হবে, যেখানে অত্যাধুনিক জাদুঘর থাকবে, যা ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করবে।’