প্রচুর টাকার টিকিট কেটেও প্রিয় তারকা লিওনেল মেসিকে দেখতে পেলেন না দর্শকরা। চূড়ান্ত ক্ষোভ। উত্তাল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। গ্যালারি থেকে মাঠে উড়ে এল ভাঙা চেয়ার, জলের বোতল। ফেন্সিংয়ের গেট ভেঙে হাজার হাজার দর্শক ঢুকে পড়লেন মাঠে। গোলপোস্টের জাল ছিড়ে কুটোপাটি। দর্শকদের হঠাতে পুলিশের লাঠিচার্জ। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। অসন্তুষ্ট মুখ্যমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিনের নির্দেশ। পুলিশে হাতে গ্রেফতার আয়োজক শতদ্রু দত্ত। দর্শধের টাকা ফেরানোর নির্দেশ।
এদিন সকাল ১১.৩০ নাগাদ যুবভারতী স্টেডিয়ামে ঢোকে মেসির গাড়ি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ ও রড্রিগো ডি’পল। গাড়ি থেকে নামার সময় দর্শক ভর্তি স্টেডিয়াম দেখে উচ্ছ্বসিত। এরপর প্রায় ৭০–৮০ জন মানুষ ঘিরে ধরেন মেসিকে। মূলত মন্ত্রী, পুলিশ কর্তারাই মেসিকে ঘিরে ধরেন। তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। ভিড়ের চাপে মেসি এক পা এগোতেও পারছিলেন না। গ্যালারি থেকে মেসিকে দেখাও যাচ্ছিল না। এরপরই দর্শকরা মেসিকে দেখার জন্য চিৎকার শুরু করে। মুখে ছিল ‘উই ওয়ান্ট মেসি’। মেসিকে ঘিরে রাখেন নিরাপত্তারক্ষীরা। স্টেডিয়ামের তিনটি জায়ান্ট স্ক্রিনেই একমাত্র মেসিকে দেখা যাচ্ছিল।
এরপর নিরাপত্তারক্ষীরা কোনও রকমে মেসিকে মাঠে নিয়ে যান। সেখানে মোহনবাগান এবং ডায়মন্ড হারবারের প্রাক্তন ফুটবলারদের সঙ্গে পরিচিত হন। সেই সময়ও তাঁকে ঘিরে ভিড় ছিল। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং আয়োজক শতদ্রু দত্ত মাইক্রোফোনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য বারবার ঘোষণা করতে থাকেন। তাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, সৌরভ গাঙ্গুলি, শাহরুখ খানের যুবভারতীতে আসার কথা থাকলেও আসেননি। মিনিট ২০ মাঠে থাকার পর মেসি যুবভারতী ছেড়ে বেরিয়ে যান।
মেসি বেরিয়ে যেতেই গ্যালারি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। প্রথমে গ্যালারিতে লাগানো হোর্ডিং ভাঙতে শুরু করেন দর্শকরা। এরপর চেয়ার ভেঙে মাঠে ছুড়তে শুরু করেন। একের পর এক বোতল মাঠে উড়ে আসে। সেই সময় গ্যালারিতে কোনও পুলিশ ছিল না। ক্রমশ উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ফেন্সিংয়ের গেট ভেঙে হাজার হাজার দর্শক মাঠে ঢুকে পড়ে। প্রথমে পুলিশ হতভম্ভ হয়ে পড়েছিল। পরে উত্তেজিত দর্শকদের লাঠিচার্জ করে গ্যালারিতে পাঠিয়ে দেয়। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দর্শকরা আবার মাঠে ফিরে আসেন। রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে যুবভারতী। কেউ যুবভারতীর মাঠে শুয়ে পড়েন। কেউ আবার গোলপোস্টের জাল কেটে দেন। এরপর মেসি যুবভারতী ছেড়ে বিমানবন্দরের পথে রওনা হন।
যুবভারতী তখন আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। চেয়ার থেকে অস্থায়ী কাঠামো ভাঙা হয়। প্লাস্টিকের জলের বোতল থেকে শুরু করে নানা জিনিস ছোড়া হল মাঠে। গ্যালারিতে রাখা মেসির কাট আউট গুলোও ভেঙে ফেলা হয়। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাউন্ড সিস্টেম। আগুন লাগানোরও চেষ্টা করা হয়৷ সবমিলিয়ে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি দেখে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে গ্যালারি, সবটাই চলে যায় দর্শকদের দখলে।
যুবভারতীতে বিশৃঙ্খলা নিয়ে হতাশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দর্শকের কাছে তিনি ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য ৩ সদস্যের কমিটিও গঠন করেছেন। কমিটির নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এক্স–এ এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘সল্টলেক স্টেডিয়াম শনিবার যে অব্যবস্থা দেখা গেল, তাতে আমি বিচলিত এবং স্তম্ভিত। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য আমি মেসি এবং সকল ক্রীড়াপ্রেমী এবং তাঁর ভক্তদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’ মেসির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি যুবভারতীতে আসছিলেন। বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়ার পর মাঝপথ থেকে ফিরে যান।
মমতা এক্স–এ জানিয়েছেন, বিশৃঙ্খলার তদন্তের জন্য তিনি একটা কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির নেতৃত্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়। এছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন মুখ্যসচিব, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। মমতা লিখেছেন, ‘এই ঘটনায় বিশদ অনুসন্ধান করবে কমিটি। যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে, তারজন্য সুপারিশ করবে এই কমিটি।’
মেসিকে নিয়ে বিমানবন্দরে ছাড়তে গিয়েচেন মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত। মেসি বিমানে ওঠার পরপরই শতদ্রুকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করএ পুলিশ। রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার জানিয়েছেন দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস। দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টিকিটের টাকা ফেরত না দেওয়া হলে শতদ্রুর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।