মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিল পাকিস্তান। তাদের সেই প্রয়াস বিফলে গেল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে ১৫ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। পাল্টা ১০টি শর্ত আরোপ করেছে। তেহরান পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ হলেই যুদ্ধ বন্ধ করা হবে।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে কোনও প্রচেষ্টাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। আমেরিকার প্রস্তাবকে বাড়তি বলে আখ্যা দিয়েছে। এক কর্তার বরাত দিয়ে ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছে, তেহরান যুদ্ধ বন্ধ করার মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনা করেছে। কিন্তু এর শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য নয়্য বলে মনে করেছে। ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন যে, প্রস্তাবটির প্রতি ইরান একেবারেই ইতিবাচক নয়। তেহরান জোর দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র ইরানের হাতেই রয়েছে। তারা ট্রাম্পকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণ করতে দেবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিরতির জন্য যে ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, সেগুলি হল:
১. ইরানকে এক মাসের জন্য যুদ্ধবিরতি পালন করতে হবে।
২. ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি প্রায় পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে।
৩. ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৪. সকল পারমাণবিক উপাদান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
৫. নাতাঞ্জ, ফোর্দো ও ইসফাহানের মতো প্রধান কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে হবে।
৬. দেশের অভ্যন্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত পরিচালনার জন্য আইএএইএ-কে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে।
৭. ইরানকে অবশ্যই তার প্রক্সি কৌশল পরিত্যাগ করতে হবে এবং হামাসের মতো সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে।
৮. এই অঞ্চলে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৯. হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
১০. ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনায় সংখ্যা ও পাল্লার ওপর সীমা আরোপ করা হবে।
১১. ইরানের সামরিক সক্ষমতা শুধুমাত্র আত্মরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
১২. ইরানের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা।
১৩. বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তা।
১৪. স্ন্যাপব্যাক ব্যবস্থা, অর্থাৎ বিধিনিষেধের আকস্মিক প্রত্যাহার, শেষ হয়ে যাবে।
১৫. ইরানকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, দেশটি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ১৫ দফা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান পাল্টা ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের এই ১০ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:
১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল কখনও ইরানকে আক্রমণ করবে না, এই নিশ্চয়তা দিতে হবে।
২. যুদ্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ইরানকে।
৩. হরমুজ নিয়ে এমন একটা নিয়ম তৈরি করতে হবে, যাতে ইরানের আয় হবে।
৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব ঘাঁটি প্রত্যাহার করতে হবে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিরাজ করতে হবে।
৫. ইরানের ওপর থেকে সকল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। বাণিজ্যের ওপর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।
৬. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের কর্মকর্তাদের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
৭. হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইজরায়েলের অভিযান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৮. মিনাবে শিশুহত্যার ঘটনা স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৯. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে না। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে গণ্য করতে হবে।
১০. ইরানকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য করতে হবে এবং ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও দিতে হবে।
প্রস্তাব, পাল্টা শর্তের আবহেই মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সূত্র সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন থেকে কমপক্ষে ১০০০ সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে। প্যারাট্রুপারদেরকে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও বিমানঘাঁটি সুরক্ষিত করার জন্য প্রতিকূল বা বিতর্কিত এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়াও জল ও স্থল আক্রমণে প্রশিক্ষিত আরও প্রায় ৫০০০ মেরিন সেনা এবং হাজার হাজার নাবিককে এই অঞ্চলে পাঠাচ্ছে পেন্টাগন।