২০১১ সালে পতন আসন্ন জেনেই দুপুরের পর রাজ্যপালের কাছে গিয়ে ইস্তফা দিয়েছিলেন প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। জনাদেশ পাওয়ার পর ২৪ ঘন্টা পার হতে চলল, এখনও পদত্যাগ করার কোনও লক্ষণ নেই বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির! সরকারের পতন ঘটার পর কখন ইস্তফা দেবেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, এই নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতি তুমুল জল্পনা, তখনই সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি জানিয়ে দিলেন, পদত্যাগ করছেন না৷
২০০–র বেশি আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৮০টি আসন। কিন্তু নির্বাচনের এই ফলাফল মানতে রাজি নন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি। তাঁর দাবি, জোর করে তৃণমূলকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ভোটগণনা কেন্দ্র দখল, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতিসক্রিয়তা এবং নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করে তাঁদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। পাশাপাশি, ক্ষমতার মায়া ত্যাগ করে আবার পথে নেমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লড়াই করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মমতা।
ইস্তফা দেওয়ার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘আমরা তো হারিনি। কেন ইস্তফা দিতে যাব। হারলে যদি শপথ নিতে যেতাম, তাহলে পদত্যাগ করতাম। এখন তো সেই প্রশ্নই ওঠে না।’ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে ছিল না, লড়াইটা ছিল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। ওরা ভিলেনের মতো কাজ করেছে।’ এই নির্বাচনী ফলাফলকে জনতার স্বাভাবিক রায় বলে মানতে একেবারেই নারাজ মমতা। গোটা বিষয়টিকে সুপরিকল্পিত চক্রান্ত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘জোর করে দখল করেছে। যদি কেউ মনে করে আমাকে গিয়ে রেজিগনেশন দিতে হবে, না, সেটা নয়। আমি এখনও বলছি যে আমরা নির্বাচনে হারিনি। এটা জোর করে আমাদের হারিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা মাত্র।’
এই গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ভোটগণনাকে তিনি জাতীয় নির্বাচন কমিশন, বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন মমতা ব্যানার্জি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের আসল জনাদেশকে সম্পূর্ণভাবে হাইজ্যাক করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব আগেই অভিযোগ তুলেছিল যে, ভোটগণনা কেন্দ্রে দলের কাউন্টিং এজেন্টদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং রির্টানিং অফিসারদের ভয় দেখানো হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই মমতা ব্যানার্জি ইভিএম এবং ভিভিপ্যাট মেশিনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, শুধু তৃণমূল নয়, অন্যান্য বিরোধী দলের এজেন্টদেরও মারধর করে গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দলীয় কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মমতা অভিযোগ করেন, দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ, সর্বত্র বিজেপির তাণ্ডব চলছে। তাঁর দাবি, তফশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত কর্মীদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রশাসন বর্তমানে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। ২০১১ সালের পরিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সেই সময় ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস কোনও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখায়নি বা সিপিএমের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করেনি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
গননার দিন ভোট কেন্দ্রে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন দাবি করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘আমাকে ধাক্কা মেরে বের করে দেওয়া হয়েছিল, শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। এমনকি পেটে ও পিঠে লাথি পর্যন্ত মারা হয়েছিল।’ তবে এখানেই তিনি থেমে থাকবেন না, আবার ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছেন। কেন্দ্রের শাসক দলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যখন তাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন না, তখন তাঁদেরও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে হার মেনে নেওয়ার প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, পরাজয় স্বীকার করছেন না। বদলে রাজপথেই মানুষের পাশে থেকে আগামী দিনে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন মমতা ব্যানার্জি।