শেখ হাসিনা বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যই কি ওসমান হাদিকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার? না হলে নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাধিস্থ করা হবে কেন ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাদিকে। অনেকের কাছেই খবরটি অবাস্তব মনে হবে। কিন্তু এটাই বাস্তব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের কাছে বিদ্রোহী কবির পাশে শুয়ে আছেন ওসমান হাদি। উত্তরাধিকার প্রশ্ন নিয়ে তৈরি হল বিতর্ক। বাংলাদেশের অনেকেই এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।
শনিবার কবরস্থ করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদিকে। যিনি আততায়ীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। শনিবার তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির পাশে সমাহিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের কাছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমাহিত করার প্রায় ৫০ বছর পর এই প্রথম কারও দেহ সেখানে কবর দেওয়া হল। হাদির দাফনের জন্য শনিবার জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল ঢাকা। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আশেপাশের শহর থেকে হাজার হাজার মানুষ হাদির দাফনের জন্য রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসও ওসমান হাদির নামাজে জানাজায় অংশ নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদয়ালয়ের মসজিদের কাছে নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে হাদিকে সমাহিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষর কাছে দুটি আবেদন জমা পড়ে। একটা আবেদন জানায় মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ডাকসু)। দুটি আবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত সমাধিস্থল পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের পর খালি জায়গাগুলির একটা ম্যাপ নোট তৈরি করা হয়েছিল এবং সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।
শুক্রবার মাঝরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর সইফুদ্দিন আহমেদ নিশ্চিত করেন যে, ওসমান হাদিকে বাংলার অন্যতম প্রতীকী কবি নজরুল ইসলামের পাশে সমাহিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০.৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি অনলাইন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ শনিবার সকাল থেকেই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে হাদির দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ঢাকাভিত্তিক সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি স্টার’ লিখেছে, এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইনকিলাব মঞ্চ জানিয়েছে, হাদির পরিবারের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি বাংলাদেশের জাতীয় কবির শেষ সমাধিস্থল। যা একটি শ্লোকে প্রকাশিত তাঁর ইচ্ছাকে সম্মান করে মসজিদের কাছে সমাহিত করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামের পাশে ওসমান হাদিকে সমাধিস্থ করার ন্যায্যতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক্স–এ আওয়ামী লীগ সমর্থক মোস্তফা আমিন লিখেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সহনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। ওসমান হাদি চরমপন্থা এবং পরিচয়ভিত্তিক ঘৃণার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তাই নজরুলের পাশে হাদিকে সমাহিত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত।’
আরও পড়ুনঃ টি২০ বিশ্বকাপের ভারতীয় দল ঘোষিত, দুই নীতি নির্বাচকদের, খারাপ ফর্মের জন্য বাদ শুভমান, অথচ নেতৃত্বে সূর্যকুমার
অন্য একজন লিখেছেন, ‘এটা লজ্জাজনক যে, এই গুন্ডাকে মহান কাজী নজরুল ইসলামের পাশে সমাহিত করা হবে।’ অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন একজন উগ্রপন্থী রাজনৈতিক নেতাকে কীভাবে বিদ্রোহী কবি নজরুলের পাশে সমাধিস্থ করা হল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন ওসমান হাদি। বাংলাদেশের অনেকেই স্পষ্ট সমান্তরাল চিত্র আঁকতে চেষ্টা করেছেন। নজরুলের লাইনগুলি হাদির অস্ত্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিহত উগ্রপন্থী এবং শেখ হাসিনা বিরোধী নেতাকে ‘নতুন বাংলাদেশ’–এর ছাত্রনেতারা ‘বিপ্লবী’–র মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।
শরীফ ওসমান হাদি হাসিনা বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ছিলেন। দলটি ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় আত্মপ্রকাশ করেছিল। ৩২ বছর বয়সী হাদি হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব এবং হাসিনার আওয়ামী লীগের একজন বিশিষ্ট সমালোচক ছিলেন, যারা প্রায়শই ভারত বিরোধী বক্তব্য রাখতেন। হাদি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে ঢাকা ৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। ভোট প্রচারের সময় ১২ ডিসেম্বর অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে আহত হন। পরে তিনি সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে মারা যান।
তাঁর মৃত্যুর পর হাজার হাজার মানুষ বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। জনতা সহিংসতা ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে দেয়। ঢাকায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলিতে লুটপাট চালানো হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ধ্বংসাবশেষে আবার আক্রমণ করা হয়। রাজধানীসহ একাধিক শহরে ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং ভারতবিরোধী স্লোগানে মুখরিত করে তোলে চারিদিক। এমনকি ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এবং ‘প্রথম আলো’র মতো সংবাদপত্রের অফিসেও অগ্নিসংযোগ করে।
এদিন হাদির জানাজায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস বলেন, ‘হে প্রিয় ওসমান হাদি, আমরা তোমাকে বিদায় জানাতে এখানে আসিনি। তুমি আমাদের হৃদয়ে আছ, এবং যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, তুমি সকল বাংলাদেশীর হৃদয়ে থাকবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে , সংসদ ভবনে জানাজার আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াস্থল এবং এর আশেপাশে পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং সেনাবাহিনীর ইউনিট মোতায়েন করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চ শাহবাগ সার্কেলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ হাদি" রাখার দাবি জানিয়েছে।