প্রায় চার মাসব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হল ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এই চুক্তির কথা নিশ্চিত করেছেন। ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ–পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদিও শান্তি চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চুক্তির শর্তের মধ্যে রয়েছে সামরিক কার্যকলাপ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। তবে, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইউরেনিয়াম মজুদ সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, এখন থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সকল দেশের জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়া হবে। ট্রুথ সোশ্যাল–এ এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে অভিনন্দন! আমি হরমুজ প্রণালীর অবাধ উন্মুক্তকরণ এবং মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিচ্ছি। বিশ্বজুড়ে জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করুন। তেলের প্রবাহ শুরু হোক!’
ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই শান্তি চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, চূড়ান্ত চুক্তির জন্য প্রস্তাবিত ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়ায় তেহরান কেবল তখনই অংশ নেবে, যদি ওয়াশিংটন সংঘাত বন্ধ করা, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানি সম্পদ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাত দিয়ে গরিবাবাদি বলেছেন, শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে এবং এরপর একটা খসড়া সমঝোতা স্মারক (মৌ) জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
গরিবাবাদি বলেন, নিজেদের হীন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আক্রমণকারী শত্রু তার সকল লক্ষ্যে পরাজিত হয়েছে এবং ইরান এই যুদ্ধে এক বিরাট বিজয় অর্জন করেছে। এই চুক্তিটি শুধু কূটনীতির ফল নয়, বরং এর অস্তিত্ব ইরানের সামরিক সাফল্যের কাছেও ঋণী। তিনি আরও বলেন যে, ব্যবস্থার শত্রুদের মোকাবিলায় জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের পবিত্র রক্তের কাছেও এটি জীবন পেয়েছে।
আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর সমঝোতা স্মারকের খসড়া প্রকাশ করা হবে। গরিবাবাদি বলেন, শুক্রবার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে এবং উভয় প্রতিনিধিদলের প্রধানরা আলোচনার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার আগে ইরান যাচাই করে দেখবে যে, যুদ্ধ শেষ করা, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে কি না।
গরিবাবাদি বলেছেন, ৬০ দিনব্যাপী এই আলোচনা শুরু হওয়া নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের ওপর। তিনি আরও বলেন, ইরান সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় তাদের সব মূল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এই দলিলটিকে ওয়াশিংটনের প্রতি আস্থার নিদর্শন হিসেবে দেখা উচিত নয়। আল জাজিরাকে গরিবাবাদি বলেন, ‘এই সমঝোতা স্মারকের অর্থ শত্রুকে বিশ্বাস করা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন আমরা পর্যবেক্ষণ করব।’
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফও ঘোষণা করেছেন যে, তীব্র আলোচনার পর একটি চুক্তি হয়েছে। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে শরীফ লিখেছেন, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। শরীফ জানিয়েছেন, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে এবং মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া সহজতর করার ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য তিনি কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। শরীফের মতে, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির জন্য বেশ কয়েকটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
সমঝোতা স্মারকের একটা খসড়ায় বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাজেয়াপ্ত ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেবে। এর মধ্যে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এবং আর্থিক ঋণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতিবেদন অনুসারে, আরাঘচি বলেছেন যে, একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেই ইরানের বাজেয়াপ্ত আর্থিক সম্পদ মুক্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, এই দলিলে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিই প্রথম এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে...
১. লেবাননের রণাঙ্গনসহ এই যুদ্ধ অবিলম্বে এবং চিরতরে বন্ধ করা হবে।
২. আমেরিকা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
৩.যুক্তরাষ্ট্র তার সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
৪. মার্কিন বাহিনী ইরানের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে সরে যাবে।
৫. ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে এবং ইরান তার তেল আয় থেকে অর্থ ফেরত পেতে সক্ষম হবে।
৬. আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সহায়তা প্রদান করবে।
৭. দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আগামী ৬০ দিন ধরে চলবে, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) অধীনে ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
৯. আলোচনা চলাকালীন আমেরিকা কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না।
১০. আলোচনা চলাকালীন আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেবে না।
১১. ইরানের জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়া হবে।
১২. চুক্তিটি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হবে।
১৩. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) কর্তৃক চূড়ান্ত চুক্তিটি অনুমোদনের চেষ্টা করা হবে।
১৪. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং এর মদতপুষ্ট প্রক্সি সংগঠনগুলো সম্পর্কিত বিষয় এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত চুক্তিতে দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নির্মূল এবং কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। তবে, এই বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। মার্কিন পক্ষ বলছে ইউরেনিয়াম ধ্বংস করে দেওয়া হবে, অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদেরকে দেশের অভ্যন্তরে কম সমৃদ্ধ রূপে তা মজুত করার অনুমতি দেওয়া হবে। এই চুক্তিটি এখনও কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়। এটি একটি প্রাথমিক চুক্তি (সমঝোতা স্মারক), যার পর আগামী ৬০ দিন ধরে বিস্তারিত আলোচনা চলবে।