বিখ্যাত ক্রিকেট লিখিয়ে নেভিল কার্ডাসের বিখ্যাত উক্তি, ‘স্কোরবোর্ড একটা গাধা’। এই উক্তির পেছনে কারণ রয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ক্রিকেটে কেবল রান সংখ্যা কিংবা উইকেট পতন শেষ কথা নয়। একটা ইনিংস কতটা নান্দনিক, পরিস্থিতি অনুযায়ী কতটা কঠিন, স্কোরবোর্ডে কখনও সেই সৌন্দর্য কিংবা গুণমান ফুটে ওঠে না। বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেনের ১–০ গোলে জয় দে লা ফুয়েন্তের দলের খেলার নান্দনিক দিক, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, একছত্র আধিপত্য ফুটে ওঠেনি। ফুটে ওঠেনি গোটা ম্যাচ জুড়ে স্পেনের হাই প্রেসিং ফুটবলের ছবি, স্পেনের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের ছবি। দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়েও ১–০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বসেরা স্পেন। ২০১০ সালের পর আবার। অন্যদিকে, ফাইনালে জঘন্য ফুটবল উপহার দিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেল আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপে বিদায়বেলা স্মরণীয় করে রাখতে পারলেন না লিওনেল মেসি।
স্কোরবোর্ড যে সবসময় ম্যাচের আসল ছবি তুলে ধরে না, বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেন ম্যাচ দেখলেই তা বোঝা যাবে। গোটা ম্যাচে নিরঙ্কুশ আধিপত্য, হাই প্রেসিং ফুটবল, একের পর এক সুযোগ তৈরি। তবুও মাত্র নামমাত্র গোলে জয়। দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়েও ১–০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বসেরা স্পেন। ২০১০ সালের পর আবার। অন্যদিকে, ফাইনালে জঘন্য ফুটবল উপহার দিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেল আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপে বিদায়বেলা স্মরণীয় করে রাখতে পারলেন না লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপ ফাইনাল অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাব, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এ কোন আর্জেন্টিনা! লিওনেল মেসিদের তো রীতিমতো জার্সি দেখে চিনতে হচ্ছিল। চূড়ান্ত একপেশে ফুটবল সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়ে যে ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন লিওনেল মেসিরা, তা কোথায়? সত্যিই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যে দলে রয়েছেন লিওনেল মেসির মতো ফুটবলা, তারা কিনা নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে বিপক্ষের তিনকাঠি লক্ষ্য করে একবারও বল রাখতে পারল না! আসলে আর্জেন্টিনাকে সেই জায়গাটুকু দেয়নি স্পেন।
আর্জেন্টিনার প্রাণ ভোমরা লিওনেল মেসি। সে কথা একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। সতীর্থরা বল ধরলেই খুঁেজে নেয় মেসিকে। আর মেসিকে আটকাতে গিয়ে অন্যদের ফাঁকা জায়গা করে দেয় বিপক্ষের ফুটবলাররা। এতদিন সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন হুলিয়ান আলভারেজ, লাওতারো মার্টিনেজ, ম্যাক অ্যালিস্টাররা। স্পেন অবশ্য এই ভুল করেনি। স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তে মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার সাপ্লাই লাইন কেটে দিয়েছিলেন। যাতে মেসি বল না পান। আর তাতেই সাফল্য।
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়ার মূল কারিগর স্প্যানিশ অধিনায়ক রড্রি। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে বল ছিনিয়ে পাল্টা আক্রমণ তৈরি করলেন। দুই প্রান্ত দিয়ে লামিলে ইয়ামাল, অ্যালেক্স বায়েনা, মাঝখান দিয়ে পেদ্রি, দানি ওলমো, ওয়ারজাবালরা আক্রমণ তুলে নিয়ে এসে নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছিলেন আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডারদের। স্পেনের দুরন্ত প্রেসিং ফুটবলে দিশেহারা আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৫ মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল স্পেনের সামনে। ইয়ামালের শট লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলে ঢোকার মুখে বাঁচান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ২৮ মিনিটে ওয়ারজাবালের জোরালো শট বাঁচালেন, কুকুরেয়ার বাঁপায়ের শট দারুণ দক্ষতায় আটকালেন। এমিলিয়ানোর বিশ্বস্ত হাতই বারবার বাঁচিয়ে দিচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে। স্পেনের আক্রমণের ঢেউয়ের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টিনার এই গোলকিপার।
দ্বিতীয়ার্ধেও সেই একই ছবি। কখনও ইয়ামালের শট বাঁচালেন, কখনও ওয়ারজাবালের। নিকো উইলিয়ামস, মিকেল মেরিনো, ফেরান তোরেসদের সামনেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলেন বারবার। অতিরিক্ত সময়েও ছবিটা বদলায়নি। নিকো উইলিয়ামসের আরও একটা হেড দারুণভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক হাতে বাঁচিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। কিছুক্ষণ পরেই নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে দিয়েছিলেন উইলিয়ামস। নিকোলাস ওটামেন্ডিকে মিকেল মেরিনো ফাউল করায় গোল বাতিল। অবশেষে ১০৬ মিনিটে সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। ডানদিক থেকে পেদ্রো পোরো সেন্টার করেছিলেন। ব্যাক হেড করেন উইলিয়ামস। দুরন্ত ভলিকে বল দালে পাঠান ফেরান তোরেসের। এই গোলেই ২০১০–এর পর আবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
ইংরেজিতে ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ বলে একটা আছে। স্পেন যদি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন না হত, ইংরেজি এই শব্দটা একেবারেই গুরুত্বহীন মনে হত। গোটা ম্যাচ জুড়ে অসাধারণ ফুটবল, মাঝমাঠে পাসের ফুলঝুড়ি, একের পর এক আক্রমণ, সুযোগ তৈরি, এর পরেও যদি কোনও দল না জেতে, তাহলে তো ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ কথাটার কোনও মূল্যি থাকত না। হ্যাঁ, স্পেন বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন না হলে সত্যিই অবিচার হত।