ভাষার বিলুপ্তি মানে শুধু শব্দের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়, এর ফলে একটা জনগোষ্ঠীর গল্প ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে ৬৩৯টি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এবং আরও হাজার হাজার ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ভারতের ২০০টি এবং বিশ্বের ৩০০০ ভাষা বিলুপ্তির পথে। ইউনেস্কোর ডাটাবেসে এমনই তথ্য উঠে এসেছে।
এমন একটা ভাষার কথা ভাবুন, যে ভাষায় একটা সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের সন্তানদের ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়েছে, গল্প বলেছে, সম্পর্কের নাম দিয়েছে এবং তাদের চারপাশের জগৎকে বুঝেছে। তারপর একদিন, সেই একই সম্প্রদায়ের সন্তানেরা সেই ভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দেয়। বাবা–মায়েরা হয়তো বাড়িতে তাদের মূল ভাষায় কথা বলা চালিয়ে যান, কিন্তু সন্তানেরা স্কুলে, বন্ধুদের সঙ্গে এবং কর্মক্ষেত্রে অন্য একটা ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে, পুরোনো ভাষাটি হয়তো পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যতক্ষণ না এমন এক সময় আসে যখন সেই ভাষায় কথা বলা শেষ ব্যক্তিটিও মারা যান।
ভাষা বিলুপ্তির গল্প প্রায়শই এভাবেই শুরু হয়। একটা ভাষার বিলুপ্তি মানে শুধু শব্দভাণ্ডার থেকে কয়েকটা শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়। এটা একটা সম্প্রদায়ের গল্প, ঐতিহ্য, অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা জ্ঞানকেও দুর্বল করে দিতে পারে। এই কারণেই ভাষাবিদরা কোনও ভাষার অবস্থা মূল্যায়ন করার সময় প্রথমে জিজ্ঞাসা করেন যে, শিশুরা এখনও তাদের পিতামাতার কাছ থেকে সেই ভাষা শিখছে কি না। যদি পরবর্তী প্রজন্ম ভাষাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখনই এর ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি শুরু হয়।
বিশ্বে এই ধরনের ভাষার সংখ্যা কম নয়। একটা গবেষণা প্রকল্পে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ৬৩৯টি ভাষাকে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২৭টি ভাষা ১৯৬০ সালের পরে বিলুপ্ত হয়েছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, যেসব বিপন্ন ভাষার বক্তাদের পরিচয় জানা গেছে, তাদের মধ্যে ১৭৪৯টি ভাষায় কথা বলার মানুষের সংখ্যা ১০০০০-এরও কম। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ লিখিত নথি, অভিধান বা ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় লিপিবদ্ধ হওয়ার আগেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
কোনও ভাষার আকস্মিক বিলুপ্তি একটা বিরল ঘটনা। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় হয় পরবর্তী প্রজন্মের বক্তাদের মধ্যে। শুরুতে শিশুরা মাতৃভাষা বোঝে, কিন্তু অন্য ভাষায় উত্তর দিতে শুরু করে। তারপর তারা সেই ভাষায় কথা বলা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। কিছুকাল পরে ভাষাটি কেবল বয়োজ্যেষ্ঠদের কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই কারণেই একটা ভাষার শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ হল, শিশুরা তাদের পিতামাতার কাছ থেকে তা শিখছে কি না। যদি ভাষার ব্যবহার এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত না হয়, তবে ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ভারতে ভাষা বিলুপ্তি সংক্রান্ত ইউনেস্কোর ডেটাবেস অনুসারে, প্রায় ২০০টি বিভিন্ন শ্রেণীর ভাষা বিপদের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ৮৪টি প্রায় বিপন্ন, ৬২টি নিশ্চিতভাবে বিপন্ন, ৬টি অতি বিপন্ন, ৩৫টি চরমভাবে বিপন্ন এবং ১৯৫০ সাল থেকে ৯টি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই ১৯৬টি ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা আনুমানিক প্রায় ২৭ মিলিয়ন এবং ইউনেস্কোর এই ডেটাবেসটি সম্প্রতি করা হয়েছে।
রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় এবং নগর সংযোগ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনও ভাষাকে বিলুপ্ত করে দেয় না। তবে, যখন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য একটা প্রধান ভাষার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ভাষাকে এই ক্ষেত্রগুলো থেকে বাদ দেওয়া হয়, তখন এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পারে। প্রায় ৭০০০ ভাষার অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, শিশুরা যখন বহু বছর ধরে প্রভাবশালী ভাষায় পড়াশোনা করে এবং বিদ্যালয়ে তাদের মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, তখন ভাষাটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। রাস্তাঘাট ছোট ছোট জনপদকে শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করে, কিন্তু এটা প্রভাবশালী ভাষাগুলোর প্রভাবও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
যুদ্ধও একটা ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। সিরিয়ার আধুনিক পশ্চিম আরামাইক ভাষা এর একটা উদাহরণ। গবেষকদের মতে, সিরিয়ার যুদ্ধ আরামাইক ভাষাভাষীদের ছড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রদায়গুলি বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় শিশুরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভাষা শোনার ও ব্যবহার করার সুযোগ হারিয়েছে। অনুমান করা হয় যে, এই ভাষার বক্তার সংখ্যা তিন হাজারেরও কম। ভাষাটিকে সংরক্ষণ করার জন্য মালুলা কথ্য ভাষার একটা ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি করা হয়েছিল, যাতে প্রায় ৬৪৮৪৫টি শব্দ, অডিও এবং ভাষাগত উপাদান রয়েছে। তবে রেকর্ডিং শুধুমাত্র ভাষাটিকে নথিভুক্ত করতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে এটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।
কৃষ্ণ সাগরের পূর্ব উপকূলে প্রচলিত উবিখ ভাষাও বাস্তুচ্যুতির কারণে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৮৬৪ সালে বহু উবিখ জনগোষ্ঠী ককেশাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের নতুন বাসস্থানে তুর্কি এবং অন্যান্য ভাষার প্রয়োজন ছিল। ধীরে ধীরে, তরুণ প্রজন্ম উবিখ ভাষা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। অবশেষে, তৌফিক ইসনাখ এই ভাষার শেষ সাবলীল বক্তা হয়ে ওঠেন। তিনি ভাষাবিদদের সঙ্গে মিলে ভাষাটির শব্দ ও ধ্বনি লিপিবদ্ধ করার কাজ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর তিন পুত্র উবিখ ভাষায় কথা বলতে পারতেন না। ১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ইসনাখের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উবিখ ভাষা একটা জীবন্ত কথ্য ভাষা হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ভাষা সংরক্ষণের বা বাঁচানোকর দায়িত্ব শুধু সরকার বা ভাষাবিদদের নয়। এর শুরুটা হতে পারে পরিবার থেকেই। যদি বাবা–মা তাদের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলেন, পরিবারগুলি তাদের সঙ্গে গল্প ও লোকগান ভাগ করে নেয় এবং বিদ্যালয়ে স্থানীয় ভাষাকে স্থান দেওয়া হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মের ভাষাভাষীদের প্রস্তুত করা সম্ভব। ডিজিটাল যুগে, সামাজিক মাধ্যম, ভিডিও, পডকাস্ট এবং অনলাইন শিক্ষাও নতুন ভাষাগুলির জন্য নতুন পথ খুলে দিতে পারে। যে ভাষায় শিশুরা আজ ভিডিও দেখছে, লিখছে এবং কথা বলছে, তা সেই ভাষার টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।