ট্রেন্ডিং

Narges Mohammadi struggle and torture in Iranian prison

‌৪৪ বছরের কারাদণ্ড, ১৫৪ বার বেত্রাঘাত, ‌নির্জন কারাবাস, তবুও জমে যাননি নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মদী

তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারের উঁচু, অন্ধকার দেয়ালের আড়ালে, যখন বন্দীদের মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করার জন্য লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছিল, তখন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নার্গেস মোহাম্মদী নীরবে কাগজের টুকরোয় ইতিহাস লিখে যাচ্ছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনী বেশ কয়েকবার তাঁর লেখার পাতাগুলো বাজেয়াপ্ত করে। ২০টিরও বেশি ডায়েরি হারিয়ে যায়। কিন্তু কখনও লেখা থামাননি নার্গিস মোহাম্মদী।

নোবেলজয়ী নার্গিস মোহাম্মদী

নাসরিন সুলতানা

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
Share on:

তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারের উঁচু, অন্ধকার দেয়ালের আড়ালে, যখন বন্দীদের মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করার জন্য লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছিল, তখন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নার্গেস মোহাম্মদী নীরবে কাগজের টুকরোয় ইতিহাস লিখে যাচ্ছিলেন। নিরাপত্তা বাহিনী বেশ কয়েকবার তাঁর লেখার পাতাগুলো বাজেয়াপ্ত করে। ২০টিরও বেশি ডায়েরি হারিয়ে যায়। কিন্তু কখনও লেখা থামাননি নার্গিস মোহাম্মদী।

নার্গিস মোহাম্মদী তাঁর নতুন স্মৃতিকথায় ইরানের এভিন কারাগারে কাটানো সময় এবং সেখানে তাঁর ওপর চালানো কথিত নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছেন। কারাগার থেকে সাময়িক চিকিৎসা প্যারোলে থাকাকালীন নার্গিস এই পাতাগুলোকে একটা স্মৃতিকথায় রূপান্তরিত করেন, যার নাম ‘‌একজন নারী কখনও লড়াই থামায় না’‌। এই মাসে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে তাঁর লেখা বইটি প্রকাশিত হচ্ছে। সিএনএন–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, ৫৪ বছর বয়সী এই মানবাধিকার কর্মী কারাগারে অমানবিক নির্যাতন এবং এই নৃশংসতার জন্য সরাসরি দায়ী কর্মকর্তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করেছেন। 

বিভিন্ন ভাষায় ‘‌আমান’‌ লেখা রঙিন পোশাক পরা মাহসা আমিনির একটা ছবির সামনে বসে নার্গিস স্পষ্টভাবে বলেন, ‘‌এই বইয়ের পর আমাকে হয়তো আবার কারাবাস এবং গুরুতর পরিণতির সম্মুখীন হতে হতে পারে। কিন্তু এটাই এই দেশ ও অঞ্চলে আমাদের জীবনের কঠোর বাস্তবতা। এই নৃশংসতাগুলো উন্মোচন করা এবং সত্যকে প্রকাশ করাই আমার প্রথম কর্তব্য।’

নার্গিস মোহাম্মদী ফাউন্ডেশনের মতে, ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার ও নারী স্বাধীনতার পক্ষে আওয়াজ তোলার জন্য নার্গিসকে ৪৪ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড এবং ১৫৪টি বেত্রাঘাতের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োর্গেন ভাটনে ফ্রিডনেস সাম্প্রতিককালে তাঁর ওপর চালানো নৃশংসতা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, গ্রেপ্তারের সময় নার্গিসকে লাঠি ও ডান্ডা দিয়ে মাথায় পেটানো হয়েছিল এবং চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাঁর মাথায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়।


আহত অবস্থায় নার্গিসকে ২ মাস নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল। তাঁকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে, তাঁর আইনজীবী ও ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। মার্চ মাসে কারাগারে থাকাকালীন নার্গিস হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁর ওজন ২০ কেজি কমে যায়। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে হৃদরোগের অবস্থা আরও খারাপ হলে নার্গিসকে ১৮ দিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নার্গিসের জেলের ডায়েরির পাতাগুলো থেকে অনেক তথ্য উঠে এসেছে। যার মধ্যে রয়েছে কীভাবে সরাসরি হত্যার পরিবর্তে একজন ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চূরমার করে দেওয়া হয়। তাঁর পরিচয়, মানবিক মর্যাদা এবং বিচারবুদ্ধিকে পুরোপুরি চূর্ণ করে দেওয়া হয়। নার্গিস বলেন, ‘‌আমি আগে থেকেই যদি জানতাম আমার সঙ্গে কী ঘটতে চলেছে, তবুও আমি বিনা দ্বিধায় সংগ্রামের পথই বেছে নিতাম।’‌ কিন্তু যখন তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত থাকা তাঁর ১৯ বছর বয়সী যমজ সন্তান আলি ও কিয়ানার কথা উল্লেখ করেন, তখন কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে নার্গিসের। তিনি বলেন, ‘‌যখন আমি আলি ও কিয়ানার দিকে তাকাই, আমার হৃদয় গভীর বেদনায় ভরে যায়।’‌

বহুবার নার্গিসের মাতৃত্বকে দুর্বলতা হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি বছরের পর বছর ধরে তাঁর যমজ সন্তানদের কণ্ঠস্বরও শোনাতে দেওয়া হয়নি। মাতৃত্বের ভালোবাসাকে দুর্বলতায় পরিণত করার ফলে তাঁকে সংগ্রাম থেকে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘‌যদি সময় বদলে যায়, তবে আমি আবার এই পথই বেছে নেব, কিন্তু সন্তানদের জন্য আমার হৃদয়ে একটা বেদনা রয়েছে।’‌ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নার্গিসের মতে, তেহরানের রাস্তায় এবং দেশের অন্যান্য শহরে নারীরা যে সাহসের সঙ্গে এখনও মাথা উঁচু করে হাঁটছেন, বিশ্ব তা দেখছে। ‘‌নারী, জীবন, স্বাধীনতা’‌ আন্দোলন সাধারণ বিক্ষোভকারীদের নৈতিক শক্তি ও বৈধতা দিয়েছিল, যা নির্মম লাঠিচার্জ, ফাঁসি এবং গুলি সত্ত্বেও সরকারকে অনেক দিক থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।

আরও পড়ুনঃ

অন্যান্য খবর

Inside Bangla is a comprehensive digital news platform. This web portal started its humble journey. Its courageous journalism, presentation layout and design quickly won the hearts of people. Our journalists follow the strict Journalism ethics.

Copyright © 2026 Inside Bangla News Portal . All Rights Reserved. Designed by Avquora