ফুটবলের দেশে যখন স্টেডিয়াম জুড়ে প্রতিধ্বনি তোলে একটাই স্লোগান, তখন শহরের এক কোণে কিছু মানুষ এক নীরব বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন। ব্যাট আর বলের প্রতিধ্বনিতে রচিত হয় ইতালির ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। অনেক বাধা–বিপত্তি অতিক্রম করে সেই ফুটবলের দেশ আজ ক্রিকেট বিশ্বকাপে।
ইতালির ক্রিকেট ইতিহাস জানতে গেলে ফিরে যেতে সুদূর অতীতে। সালটা ১৭৯৩। নেপলসে অ্যাডমিরাল হোরেশিয় নেলসন প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করেছিলেন। এর ঠিক ১০০ বছর পর স্যার জেমস এডওয়ার্ড স্পেন্সলি জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। এর কিছুদিন পরেই মিলান ও তুরিনেও একই ধরনের ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর মাঝেই পথের কাঁটার মতো বাধ সাধলো ফ্যাসিবাদ। শুধু এটাই শেষ নয়, এরপর শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সমগ্র বিশ্ব তোলপাড় করা যুদ্ধের আঁচ থেকে রেহাই পায়নি ইতালীয় ক্রিকেট সাম্রাজ্য। তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন যেন আক্ষরিক অর্থেই বিলুপ্ত হয়ে গেল।
আপাতদৃষ্টিতে যবনিকা পতন হয়েছে বলে মনে হলেও পরবর্তীকালে ফিনিক্স পাখির মতোই ক্রিকেট প্রত্যাবর্তন করেছিল ইতালির মাটিতে। মূলত ১৯৫০–৬০ এর দশকে ইতালিতে ক্রিকেট আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। ফ্যাসিবাদী যুগে খেলার পতনের পর রোমে আয়োজিত একটা টুর্নামেন্টের মাধ্যমে পুনরায় নীরব বিপ্লব ঘটে। যুদ্ধ পরবর্তী এই প্রাথমিক ম্যাচগুলিতে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন, অস্ট্রেলিয়ান এবং ব্রিটিশ দূতাবাস, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বেদা কলেজ এবং জৈনিক ইংলিশ কলেজ অধ্যায়নরত পুরোহিতেরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর থেকেই তরুণদের মধ্যে ক্রিকেট ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফুটবলপ্রাণ একটা দেশ, ব্যাট–বলের ছন্দে বুনতে থাকে আগামী দিনের রঙিন স্বপ্ন।
ক্রিকেটকে তো বিলুপ্তির পথ থেকে বাঁচানো গেল! কীভাবে আরও জনপ্রিয় করা যায়? প্রয়োজন ছিল পরিকাঠামোর উন্নয়ন, একটা স্থায়ী সংস্থা। এই লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যাসোসিয়েশন ইতালিয়ানা ক্রিকেট। যা পরবর্তীকালে নাম বদলে হয় ফেডারেজিয়ন ক্রিকেট ইতালিয়ানা। এরপর স্বাভাবিকভাবে ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটের অনুরাগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এবার বিশ্বের দরবারে স্থান পাওয়ার অপেক্ষা। ১৯৮৪ সালে আইসিসি স্বীকৃতি দেয় ইতালিকে। এরপর ১৯৯৫ সালে সহযোগী সদস্যর মর্যাদা লাভ করে। আইসিসি–র স্বীকৃতির পর অবশেষে ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ ফেদেরাজিওনে ক্রিকেট ইতালিয়ানা নামে পরিচিতি লাভ করে।
একটা ফুটবল পাগল দেশের ক্রিকেটের সাম্রাজ্যে পদার্পণের ইতিহাস যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই দলের বর্তমান সাফল্য ইতালীয় ক্রিকেট অনুরাগীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৬ টি২০ বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন পর্বে চমক। প্রথমবারের মতো আইসিসি–র কোন পূর্ণ সদস্যের দলকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। আরও চমক বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ২০২৬ টি২০ বিশ্বকাপে। ইতালির বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার জন্য জো বার্নসকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। তিনিই ছিলেন দলকে বাছাইপর্বের ফাইনালে তোলার মূল কাণ্ডারী।
২০২৬ টি২০ বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে ইতালির সঙ্গে রয়েছে স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড, নেপাল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করবে ইতালি। ১২, ১৬ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ড, নেপাল এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ম্যাচ।
ইতালির ক্রিকেট জগতে উত্থান কেবল একটা ক্রীড়া সাফল্যের গল্প নয়। একটা স্বপ্নকে সফল করার কাহিনী। সীমানা ছাড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার গল্প। ফুটবলকেন্দ্রিক দেশ হলেও ব্যাট–বলের ছন্দে ইতালি ক্রমশ নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছে ক্রিকেটের মানচিত্রে।