টি-টোয়েন্টি মানেই ঘন ঘন ম্যাচের রং বদল। ঘন ঘন পরিস্থিতি বদল। ভারতের নির্বাচকদেরও হয়েছে সেই অবস্থা। টি-টোয়েন্টি ঘোরানোর দল বাছতে গিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা যেন বারবার বদলে যাচ্ছে। না আছে দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা, না আছে, নিজেদের ভাবনার ধারাবাহিকতা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল নির্বাচনের পর সেটা আবার কেন পরিষ্কার হয়ে গেল। হঠাৎ নির্বাচকদের মনে হল শুভমান গিলকে এবার বাদ দেওয়া দরকার। বাদ দিয়েও দিলেন। কেউ ব্যর্থ হলে তাকে বাদ দেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু শুভমান গিল ছিলেন টি-টোয়েন্টি ঘরানায় সহ অধিনায়ক। মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁকে সহ অধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। তিনি টেস্ট করা নয় দেশের অধিনায়ক। একদিনের ক্রিকেটেও নেতৃত্বের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই। তিনি টি-টোয়েন্টি ঘরানায় সেভাবে সক্রিয় ছিলেনও না। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে একদিনের সিরিজে খেলতেও পারেননি। হঠাৎ সহ অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা হয়ে গেল। ফর্মে থাকা ওপেনার সঞ্জু সামসনকে বসিয়ে তাঁকে ওপেন করতেও পাঠিয়ে দেওয়া হল। এটা ঘটনা, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এই টি-টোয়েন্টি সিরিজে নিজেকে একেবারেই মিলে ধরতে পারেননি। তাই বলে দলের সহ অধিনায়ককে কদিন যেতে না যেতেই সরাসরি ছেঁটে ফেলা! তাহলে তাকে সহ অধিনায়ক করারই কী দরকার ছিল?
ভারতীয় ক্রিকেটের সব থেকে হতভাগ্যসহ অধিনায়ক সম্ভবত রবি শাস্ত্রী। তখন অধিনায়ক সুনীল গাভাসকার। অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা হল মুম্বাইয়েরই রবি শাস্ত্রীর নাম। গাভাসকার নেতৃত্ব ছেড়ে দিলেন। অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা হল কপিল দেবের নাম। রবি থেকে গেলেন ভাইস ক্যাপ্টেন। ৮৭ বিশ্বকাপের পর নেতৃত্ব গেল কপিল দেবের। নতুন অধিনায়ক দিলীপ বেঙ্গসরকার। তখনও ভাইস ক্যাপ্টেন সেই রবি শাস্ত্রী। একটা সময় বেঙ্গসরকারের মাথা থেকেও নেতৃত্বের মুকুট খুলে নেওয়া হল। নেতৃত্বে আনা হল তামিলনাড়ুর মারকুটে ব্যাটসম্যান কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তকে। যথারীতি এবারও নম্বর টু, অর্থাৎ ভাইস ক্যাপ্টেন থেকে গেলেন রবি শাস্ত্রী।
সেবার পাকিস্তান সফর থেকে টেস্ট সিরিজ ড্র করে ফিরেছিল ভারত। সেই সময়ের নিরিখে এটা রীতিমতো বড়সড় সাফল্যই বলা যায়।। কারণ গোটা আটের দশক জুড়ে ভারত লাগাতার পাকিস্তানের কাছে হেরেই চলেছিল। তা দেশের মাটিতেই হোক, বা বিদেশে। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজ ড্র হলেও শ্রীকান্তের ব্যাটে তেমন রান ছিল না। ফলে দেশে ফিরে আসার পর নেতৃত্বের মুকুট তো গেলই, দল থেকেও বাদ পড়ে গেলেন শ্রীকান্ত। নতুন অধিনায়ক হায়দ্রাবাদের মহম্মদ আজহারউদ্দিন। কিন্তু ভাইস ক্যাপ্টেন কে? যথারীতি এবারও সেই রবি শাস্ত্রী। সহ অধিনায়ক থাকতে থাকতেই এক সময় টেস্ট ও একদিনের ক্রিকেট থেকে চিরতরে বাদ পড়ে গেলেন।
অথচ রবি শাস্ত্রের যা ক্রিকেট বুদ্ধি, দেশের অন্যতম সেরা অধিনায়ক হতেই পারতেন। ৮৭ সালের ইডেন টেস্ট। দুরন্ত শত রানের পরেও উইনস্টন ডেভিসের বলে হাত ভেঙে গেল অধিনায়ক বেঙ্গসরকারের। পরের চেন্নাই টেস্টে খেলতে পারবেন না। নেতৃত্ব এল রবি শাস্ত্রীর হাতে। চেন্নাই দেখল দুরন্ত ঘূর্ণি। ২ ইনিংস মিলিয়ে ১৬ টি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন নরেন্দ্র হিরোয়ানি। প্রায় দাঁড়াতেই পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কয়েক মাস পরেই এশিয়া কাপ। এবারও নেতৃত্বে শাস্ত্রী। হিরওয়ানি, আরশাদ আইয়ুবদের সৌজন্যে সেবার চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। অধিনায়ক সেই শাস্ত্রী। কিন্তু তারপরেও তার নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কারণ চোট সারিয়ে তারপরই ফিরে এলেন বেঙ্গসরকার।
ঠিক ততটা না হলেও আরো এক হতভাগ্য সহ অধিনায়ক হলেন গৌতম গম্ভীর। সবে ভারত বিশ্বকাপ জিতেছে। ফাইনালে দুরন্ত ইনিংস খেলেছেন গম্ভীর। ধোনির ডেপুটি হিসেবে তাকেই পাঠানো হল অস্ট্রেলিয়া সফরে। এবার শোচনীয় পরাজয় হয়েছিল ভারতের। অধিনায়ক ধোনির ব্যাটেও তেমন রান ছিল না। ফিরে আসার পর ধোনির গায়ে তেমন আঁচ পড়ল না। মাঝখান থেকে সহ অধিনায়কের চাকরি গেল গৌতম গম্ভীরের। একটা সময় হঠাৎ করে সহ অধিনায়ক করে দেওয়া হল বিরাট কোহলিকে।
সহ, উপ, এই শব্দগুলোর পিছনে রয়ে গেছে অনেক দীর্ঘশ্বাস। সহঅধিনায়ক ছিলেন, অথচ অধিনায়ক হতে পারেননি, এই তালিকাটা বেশ লম্বা। কিন্তু যিনি দুটো ঘরানায় দেশের অধিনায়ক, তাকে টি-টোয়েন্টি ঘরানায় এভাবে বিড়ম্বনায় ফেলার কী দরকার ছিল? শচীন একবার নেতৃত্ব ছেড়েছিলেন। তারপর থেকে আর তো কখনও সহ অধিনায়ক হননি। ধোনি বা কোহলি কি নেতৃত্ব ছাড়ার পর সহ অধিনায়ক হয়েছিলেন? তাহলে শুভমানকেই বা এমন বিড়ম্বনায় ফেলার কী দরকার ছিল?