পনেরো বছরের এক দীর্ঘ সফর, যে সফরে কখনও ছিল বিরহ, কখনও প্রেম, আবার কখনও বা জীবনের নিগূঢ় দর্শনের সুর। জিয়াগঞ্জের সেই অত্যন্ত সাধারণ চেহারার মানুষটি, যিনি সাফল্যের শিখরে বসেও অবলীলায় সাধারণ স্যান্ডেল আর সাধারণ পোশাকে ঘুরে বেড়াতে পারেন। ‘অরিজিৎ সিং’, নামটা আজ কেবল একজন গায়কের নয়, বরং কোটি কোটি বাঙালির এবং ভারতীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের এক আবেগের নাম।
সম্প্রতি তাঁর প্লেব্যাক মিউজিক থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত এবং শাস্ত্রীয় সংগীত ও নিজস্ব ভাবনার গানে মনোনিবেশ করার ঘোষণাটি যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি তাঁর সৃজনশীলতার তাগিদে একঘেয়েমি কাটাতে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভক্তকুলের যে হাহাকার এবং ভার্চুয়াল শোকসভা শুরু হয়েছে, তা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?
অরিজিৎ সিং সঙ্গীত জগৎ থেকে অবসর নেননি, তিনি কেবল বলিউডের সেই নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালাই করা প্লেব্যাক মিউজিকে ইতি টেনেছেন। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বলিউডের একই ঘরানার সুর, একই রকম বিরহের আবহ আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের গোলকধাঁধায় নিজেকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। অরিজিৎ সিংয়ের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ফেরা বা নিজের লেখা গানে সুর দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আসলে তাঁর আত্মিক মুক্তির পথ। অথচ আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া এমন এক অদ্ভুত জায়গা, যেখানে সত্যের চেয়ে সোরগোল বেশি গুরুত্ব পায়।
যারা সারা জীবন কেবল বলিউডের চটজলদি হিট গান শুনে বড় হয়েছেন, শাস্ত্রীয় সংগীতের ‘সা–রে–গা–মা’ সম্পর্কে যাঁদের ন্যুনতম ধারণা নেই, কিংবা রাগ–রাগিণীর সূক্ষ্ম কাজ যাঁদের কান ধরতে পারে না, আজ তাঁরাই সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছেন অরিজিতের এই বিদায়ে। এই যে না বুঝে হাহাকার করা এবং বিষয়টিকে একটা জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরা, এটাই হল সেই আদিখ্যেতা যা একজন নিভৃতচারী শিল্পীর প্রকৃত উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়।
আরও পড়ুনঃ নতুন কন্ঠস্বর উঠে আসুক, সিনেমায় গান গাওয়া থেকে অবসর, তবে সঙ্গীত বন্ধ করছেন না অরিজিৎ সিং
আরও পড়ুনঃ ‘আচ্ছা চলতা হু দুয়াও মে ইয়াদ রাখনা’, অরিজিতের অনুরাগীদের মনে এই গানটাই বেজে চলেছে
প্রখ্যাত লেখক সায়ক আমান এই ধরণের পরিস্থিতি দেখেই বলেছেন, ‘ভায়েরা, একটু শান্ত হোন। অরিজিৎ সিং শুধু নতুন প্লে ব্যাক করবেন না বলেছেন। আমি আর গান গাইব না, এই কথাটা তো গুরুদক্ষিণা সিনেমাতে তাপস পাল বলেছিল।’ অরিজিৎ সিং বরং একটা সীমাবদ্ধ দরজা বন্ধ করে এক বিশাল দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। যারা মনে করছেন অরিজিৎ সিং ফুরিয়ে গেছেন বা তিনি প্লেব্যাক ছেড়ে দেওয়া মানেই সুরের দুনিয়া থেকে তাঁর বিদায়, তাঁরা আসলে সঙ্গীতের গভীরতা বোঝেন না।
আমাদের বোঝা উচিত যে, বলিউডের প্লেব্যাক একজন শিল্পীর শেষ গন্তব্য হতে পারে না। সেখানে বাজারজাত চাহিদার কাছে শিল্পীকে মাঝে মাঝে আপস করতে হয়। অরিজিৎ সিং হয়তো সেই আপস থেকে মুক্তি চেয়েছেন। তাঁর এই সাহসকে কুর্নিশ জানানো উচিত ছিল নীরবে, কিন্তু আমরা সেটাকে ঘিরে এত শোরগোল তুললাম যে মূল বিষয়টিই হারিয়ে গেল। অতি–আদিখ্যেতা অনেক সময় প্রতিভাকে অপমানিত করে। তখন মনে হয় তাঁরা কি সত্যিই অরিজিৎ সিংকে ভালোবাসেন, নাকি কেবল তাঁর গাওয়া চার–পাঁচটি জনপ্রিয় বলিউড গানকে মিস করার ভয়ে এই মাতামাতি করছেন?
আসলে অরিজিৎ সিংয়ের এই সরে দাঁড়ানোটা কোনও বিয়োগান্তক নাটক নয়, বরং এক সৃজনশীল উত্তরণ। ভক্তদের সস্তা আদিখ্যেতা বা হুজুগে কান্নাকাটি একজন প্রকৃত শিল্পীর সাধনাকে অপমানিত করে। আসুন আমরা হট্টগোল কমিয়ে তাঁর নতুন সুরের অপেক্ষায় থাকি। কারণ গায়ক ফুরিয়ে যাননি, তিনি কেবল তাঁর শিল্পের নতুন দিগন্ত খুঁজে নিয়েছেন। তাঁর এই সাহসই প্রমাণ করে যে সত্যিকারের শিল্পী কোনও গণ্ডিতে আটকে থাকেন না।