চলতি বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তনে ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছে আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দে, মিশরের পর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড। তিনটি ম্যাচেই পিছিয়ে পড়ে দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়েছিলেন লিওনেল মেসিরা। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিরুদ্ধে তো ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ২–০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ম্যাচে ফিরে এসেছিল। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও দুরন্ত জয়। ইংল্যান্ডকে ২–১ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা।
রাজনৈতিক কারণে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিবাদ। ১৯৮২ সালের সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি এখনও ‘আলবিসেলেস্তে’ মনে টাটকা। ফুটবল মাঠেও বারবার প্রভাব ফেলেছে ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দুই দেশের মধ্যে গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকায়, ম্যাচটি যে উত্তেজনাপূর্ণ হবে তা আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। মার্সিডিজ–বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই সুস্পষ্ট উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
একদিকে ছিল বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্প, অন্যদিকে, ৬০ বছর পর ফাইনালে ওঠার হাতছানি। দুই দলের কাছেই ম্যাচটির অন্য তাৎপর্য ছিল। আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা যে একটু বেশিই উজ্জীবিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ, তাদের সামনে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়ের হাতছানি। দুই দলের মরিয়া প্রয়াসে ম্যাচের প্রথমার্ধ হয়ে ওঠে ফাউলে জর্জরিত ও উত্তেজনাপূর্ণ। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ‘ফিজিক্যাল ব্যাটল’। মনে হচ্ছিল মাঠেই হয়তো ফকল্যান্ড যুদ্ধ আবার ফিরে এসেছে।
মেসিকে ফাউল করার অপরাধে ৩৭ মিনিটে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন অ্যান্ডারসন। নজরকাড়া শারীরিক লড়াইয়ে প্রথমার্ধে অধিকাংশ সময় খেলা সীমাবদ্ধ থাকল দুই দলের পেনাল্টি বক্স পর্যন্ত। প্রথমার্ধে দুই দলেরই একটা করে গোলমুখী আক্রমণ। ৩৮ মিনিটে প্রথম গোল লক্ষ্য করে শট আর্জেন্টিনার। এনজো ফার্নান্ডেজের শট পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের জন স্টোনসের একটা হেড বাইরে চলে যায়। আসলে কোনও দলই ঝুঁকি নিতে চায়নি। মেসিকেও সেভাবে চোখে পড়েনি।
বিরতির পর খেলা একেবারে বদলে যায়। ৪৭ মিনিটেই আর্জেন্টিনার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। জুলিয়ান আলভারেজের শট ইংল্যান্ড গোলকিপার পিকফোর্ড কোনও রকমে আটকান। ৫৫ মিনিটে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। হ্যারি কেনের কাছ থেকে বল পেয়ে মর্গান রজার্স আর্জেন্টিনার বক্সে নিচু সেন্টার করেন। মোলিনার কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে জালে পাঠান অ্যান্থনি গর্ডন। এরপরই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৫৭ মিনিটে সমতা ফেরানোর সুযোগ এসেছিল। জুলিয়ানো সিমিওনে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে গেছিলেন। সামনে শুধু ইংল্যান্ড গোলকিপার পিকফোর্ড। পেছন থেকে ছুটে এসে দুর্দান্ত ট্যাকল করে রক্ষা করেন জন স্পেনস।
৬৯ মিনিটে আবার সমতা ফেরানোর সুযোগ। ডানদিক থেকে মেসির দুরন্ত ক্রসে হেড করেছিলেন নিকো গঞ্জালেস। অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ডানদিকে ঝাঁপিয়ে নিশ্চিত গোল বাঁচান পিকফোর্ড। ডিহাইড্রেশন ব্রেকের পর তিনটি পরিবর্তন করেন স্কালোনি। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নাহুয়েল মোলিনা ও জুলিয়ানো সিমিওনের বদলে মাঠে নামান নিকোলাস ওটামেন্ডি, রড্রিগো ডি পল ও গনসালো মন্তিয়েলকে। এরপরই ইংল্যান্ড সীমানায় শুরু হয় আর্জেন্টিনার তাণ্ডব। ৭৫ মিনিটে আবার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন পিকফোর্ড। নিকো গঞ্জালেজের হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকে দেন।পরের মুহূর্তেই ম্যাচ অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্ডেজের শট আটকে দেন পিকফোর্ড। তবে এবার আর শেষরক্ষা হয়নি। ফিরতি বল পেয়ে যান মেসি। পাস বাড়ান এনজো ফার্নান্ডেজকে। বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের অবিশ্বাস্য শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান এনজো ফার্নান্ডেজ। তখনও চূড়ান্ত নাটক বাকি। মনে হচ্ছিল ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে এগোবে, তখন আবার ঝলসে ওঠে মেসির পা। ইনজুরি সময়ের ২ মিনিটের মাথায় মাথায় ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বল পান মেসি। তাঁর দুরন্ত সেন্টারে অনেকটা লাফিয়ে উঠে হেডে বল জালে পাঠিয়ে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে তোলেন লাওতারো মার্টিনেজ। বেঁচে রইল মেসির টানা ২ বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।