ইতিহাস সৃষ্টি করল মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আর্টেমিস ২ অভিযান। আর্টেমিস ২ অভিযানের চারজন নভোচারী চাঁদের চারপাশে যাত্রা সম্পন্ন করেছেন। এই যাত্রার সময় নভোচারীরা চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা এর আগে কোনও মানুষ যা দেখেননি। মঙ্গলবার ভারতীয় সময় ভোর ৫:১২ মিনিটে চাঁদের দূরবর্তী অংশের পেছন থেকে আর্টেমিস ২ ক্যাপসুল বেরিয়ে আসার সময় ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক প্রথম সংকেত পাঠায়।
মহাকাশের আরও গভীরে ভ্রমণের পর, আর্টেমিস ২–র নভোচারীরা সোমবার রাতে তাঁদের চন্দ্র ক্যাপসুলটি পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়েছেন। এর মাধ্যমে এক ঐতিহাসিক মহাকাশ যাত্রার সমাপ্তি ঘটল। নভোচারীরা দূর থেকে পৃথিবীর এমন দৃশ্য উন্মোচন করেছেন, যা আগে কেউ কখনও দেখেনি। চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে নভোচারীরা তাঁদের ক্যাপসুলটি পৃথিবীর দিকে ঘোরান। চন্দ্রাভিযানের সময় তাঁরা মহাজাগতিক দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করেন।
আর্টেমিস ২ অভিযান, অ্যাপোলো ১৩ অভিযানের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ১৯৭০ সালে পৃথিবী থেকে ২৪৮৬৫৫ মাইল (প্রায় ৪০০১৭১ কিমি) দূরত্ব অতিক্রম করেছিল অ্যাপোলো ১৩। মানব ইতিহাসে এতদিন পর্যন্ত সেটাই ছিল দীর্ঘতম দূরত্বের মহাকাশ অভিযানের রেকর্ড। অ্যাপোলো ১৩ থেকেও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে। আর্টেমিস ২ অভিযানে নভোচারীরা ২৫২০০০ মাইল (৪০৬০০০ কিমি) দূরত্ব অতিক্রম করেছেন। এই অভিযানকে মানব মহাকাশ যাত্রার ইতিহাসে একটা বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চাঁদে অভিযানকারী নাসার এই দলে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। কানাডিয়ান মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন এই দৃশ্যকে অবিশ্বাস্য বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, চাঁদ থেকে পৃথিবী ও মহাকাশ দেখাটা তাঁর কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শীঘ্রই এই রেকর্ড ভাঙার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।
নাসার মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কচ বলেছেন, কাছ থেকে দেখলে চাঁদকে বেশ বাদামী দেখাচ্ছিল। মহাকাশচারীরা উচ্চমানের ক্যামেরা এবং তাঁদের আইফোন ব্যবহার করে চাঁদ ও পৃথিবীর একযোগে ছবি তুলেছেন। পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেছেন, কিছু পর্বত এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে সেগুলোকে বরফাবৃত বলে মনে হচ্ছিল।
আর্টেমিস ২–র নভোচারীরা পৃথিবীতে ফেরার পথে সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁরা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সম্মুখীন হন, যখন চাঁদ ক্ষণিকের জন্য তাঁদের দেখার স্থান থেকে সূর্যকে আড়াল করে দেয়। নভোচারীরা তাঁদের মহাকাশযান থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাদের মতে বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন।
যদিও এই অভিযান একেবারেই মসৃন ছিল না। চার সদস্যের দলটি প্রায় ৪০ মিনিট ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, কারণ চাঁদের বিশাল আকৃতি পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ শারীরিকভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সংযোগ পুনঃস্থাপনের পর নভোচারীরা স্বস্তি প্রকাশ করেন এবং একজন সদস্য বলেন যে, পৃথিবী থেকে আবার বার্তা পাওয়াটা দারুণ ব্যাপার। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটা চন্দ্র অভিযানের পরিকল্পিত অংশ ছিল। মহাকাশযানটি যখন চাঁদের পেছন দিয়ে তার গতিপথ অনুসরণ করছিল, তখন এটা এমন একটা অঞ্চলে প্রবেশ করে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ছায়া অঞ্চল’ বলে থাকেন। এই সময়ে চাঁদ একটা বিশাল ঢাল হিসেবে কাজ করে আমাদের গ্রহে বেতার তরঙ্গ পৌঁছাতে বাধা দিত।
এই বিচ্ছিন্ন থাকার সময়টা যে কোনও চন্দ্রাভিযানের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পর্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ এই সময়ে নভোচারীদেরকে পৃথিবাতে থাকা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা ছাড়াই স্বাধীনভাবে মহাকাশযানের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও চারজন মহাকাশচারী তাঁদের নির্ধারিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা চন্দ্রপৃষ্ঠের দূরবর্তী অংশ অতিক্রম করছিলেন, যা আমাদের দৃষ্টি থেকে চিরকাল আড়ালে থাকে। মঙ্গলবার, ভারতীয় সময় ভোর ৫:১২ মিনিটে, চাঁদের দূরবর্তী অংশের পেছন থেকে আর্টেমিস ২ ক্যাপসুলটি বেরিয়ে আসার সময় ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক আবার সংকেত পাঠায়।
আর্টেমিস ২ অভিযানকে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ভবিষ্যতে মানুষের অবতরণের পথে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই অভিযান কেবল একটা প্রযুক্তিগত সাফল্যই নয়, বরং এটি মানুষের সাহস ও কৌতূহলের প্রতীকও হয়ে উঠেছে।