শি জিনপিং চান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তাঁর পারমাণবিক শক্তি যেন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে
পারমানবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণ নিয়ে ইরানের পর চীন ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। চীন তার পারমাণবিক অস্ত্রাগার শুধু সম্প্রসারণই করছে না, পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষার জন্য অনন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তৈরি করছে। পশ্চিমী গণমাধ্যমের হাতে আসা স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে এই তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছে। এই স্যাটেলাইট চিত্রগুলি চীনের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক তুলে ধরেছে, যা ভেদ করার শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও নেই। শুধু তাই নয়, চীন তার পারমাণবিক অস্ত্র রক্ষার জন্য আরও একটা বিপজ্জনক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
কৌশলগতভাবে চীন কখন কী করে, তা কোনও দেশই জানতে পারে না। চীনের সামরিক শক্তি ও প্রস্তুতি সম্পর্কে বিশ্ব ততটুকুই জানতে পারে, যতটুকু চীন সরকার জানাতে চায়। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটা স্যাটেলাইট চিত্র চীনের গোপন রহস্য ফাঁস করে দিয়েছে। এই ছবিগুলি টোকিও থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অস্বস্তি বাড়িয়েছে আমেরিকার।
ছবিগুলি চীনের শিনজিয়াং প্রদেশের একটা মরুভূমি থেকে তোলা, যেখানে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলি মজুত করে রাখা হয়েছে। এই পারমাণবিক ভান্ডারকে রক্ষা করার জন্য চীন মরুভূমিতে ব্যাপক নির্মাণকাজ করছে। চীনের পারমাণবিক ভান্ডারের কাছে নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, বাঙ্কার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশাল নেটওয়ার্ক দেখা গেছে।
কয়েক মাস আগেও এই মরু অঞ্চলটিকে জনশূন্য মনে হত। এখন স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে, চীন এই মরুভূমির ওপর ক্ষেপণাস্ত্রের একটা আস্ত শহর গড়ে তুলেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই নতুন নির্মাণের মাধ্যমে চীন এই বার্তা দিতে চায় যে, ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ওপর হামলা করে, তবে তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস হতে দেবে না। তাই, পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ রক্ষার জন্য একটা ত্রিস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
মরুভূমিতে নির্মিত এই চক্রব্যূহে তিনটি অষ্টভুজাকৃতির সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই তিনটি অষ্টভুজ মূলত একটা ত্রিস্তরবিশিষ্ট ড্রাগন চক্রব্যূহ। এই চক্রব্যূহের প্রথম স্তরটি একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত এবং এতে প্রধান কমান্ড ভবনটি রয়েছে। দ্বিতীয় স্তরটি হল সামরিক কর্মকর্তা ও সৈন্যদের থাকার জন্য নির্মিত ভবনগুলোর এক বৃহৎ বলয়াকার বিন্যাস। তৃতীয় স্তরটি ভারী সামরিক যানবাহন এবং প্রাণঘাতী ট্রাকবাহিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক গোপন ও সংরক্ষণ করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই পারমাণবিক কমপ্লেক্সটি চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশে নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে চীন তার দীর্ঘতম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখা সাইলোগুলোর কাছে ৮০টিরও বেশি নতুন কংক্রিটের লঞ্চ প্যাড ও বাঙ্কারের একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। মরুভূমিতে নির্মিত এই কংক্রিটের প্যাডগুলো চীনের ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং বিমানপ্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারির বহর রাখার জন্য যথেষ্ট বড়।
চীন প্রায় ৩৫০টি নতুন মিসাইল সাইলো তৈরি করছে। এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক নির্মাণ কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সাইলোগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রর জন্য। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ১২,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লায় আঘাত হানতে সক্ষম। এর অর্থ হল, চীন থেকে উৎক্ষেপিত একটা ক্ষেপণাস্ত্র সহজেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর অনুসারে, চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ৬০০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে যাবে। এর অর্থ হল, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো চীনও এখন একটা পারমাণবিক মহাশক্তি হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। শি জিনপিং চান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তাঁর পারমাণবিক শক্তি যেন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে, আর একারণেই মরুভূমিতে জনবসতি স্থাপন করা হচ্ছে।