মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট মেটাতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা শান্তি আলোচনায় বসেছিলেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান তাঁদের শর্ত মানতে রাজি নয়। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
১৯৭৯ সালের পর ওয়াশিংটন ও তেহরান এই প্রথম সরাসরি আলোচনায় বসেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ২১ ঘণ্টা ধরে শান্তি আলোচনা চলেছিল। মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রধান শর্ত ছিল, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে, যা ইরান মানতে রাজি হয়নি। এটা কোনও গোপন বিষয় নয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একেবারে শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। আমেরিকার একমাত্র পরিকল্পনা হল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা। এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার এটাই প্রধান কারণ।
ইরানের পক্ষ থেকে চারটি দাবি করা হয়েছিল। এই দাবিগুলি ছিল, ১) হরমুজ প্রণালীর উপর নিয়ন্ত্রণ, ২) পারমাণবিক কর্মসূচি, ৩) ইরানের উপর যে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে, তা তুলে নিতে হবে, এবং ৪) ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের অবসান। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান শর্ত ছিল, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এবং এমন কোনও উপকরণও অর্জন করবে না, যা দিয়ে দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি শর্তই ইরান মানতে রাজি হয়নি।
এই আলোচনা প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি জারি করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘আমেরিকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং অপকর্মের অভিজ্ঞতা আমরা ভুলিনি এবং কখনও ভুলবও না। যুদ্ধের সময় তাদের এবং জায়নবাদী শাসনের দ্বারা সংঘটিত জঘন্য অপরাধ আমরা কখনো ক্ষমা করব না।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, হরমুজ প্রণালী, পারমাণবিক বিষয়, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরান ও এই অঞ্চলের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইরান আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর কোনও আলোচনার পরিকল্পনা নেই। ইউরেনিয়াম ও হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনা থমকে গেছে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোনোও চুক্তি হয়নি। আইআরজিসি নৌ কমান্ড প্রণালীটি দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচলের খবর অস্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে যে সামরিক জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার যে কোনোও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই পথটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অসামরিক জাহাজের জন্য অনুমোদিত।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শান্তি আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা কোনও চুক্তিতে পৌঁছতে পারিনি। আমাদের কোনও শর্ত মানতে রাজি হয়নি ইরান। আমি মনে করি, এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বেশি খারাপ খবর।’ তিনি আরও বলেন, ‘আলোচনার কোনও ত্রুটির জন্য পাকিস্তান দায়ী নয়। ওরা দারুণ কাজ করেছে এবং আমাদের ও ইরানিদের মধ্যেকার মতপার্থক্য দূর করে একটা চুক্তিতে পৌঁছতে সত্যিই চেষ্টা করেছে। আমরা গত ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেছি।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমরা ইরানের কাছ থেকে একটা সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দেখতে চেয়েছিলাম যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা এমন কোনো সরঞ্জাম অর্জন করবে না যা দিয়ে দ্রুত তা তৈরি করা সম্ভব। এটাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান উদ্দেশ্য। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা এটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু ইরান রাজি হয়নি।’ ভ্যান্স বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব দিয়েছিল এবং আলোচনায় নমনীয়তা দেখিয়েছিল। ইরানি আলোচকরা চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে রাজি হননি। আমরা খুবই সহযোগিতামূলক ছিলাম।’
এদিকে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি বৈঠকে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। রবিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে বলেছেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে প্রস্তুত। দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে কথা বলার বিবরণ দিয়ে ক্রেমলিন জানিয়েচে, ‘ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিনি এই সংঘাতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া সহজতর করতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে প্রস্তুত।’
রাশিয়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার অজুহাত হিসেবে ইরানের পক্ষ থেকে আসা একটা কাল্পনিক হুমকি ব্যবহারের অভিযোগ করেছে এবং বলেছে, ইরানিদের তাদের নেতাদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য ওয়াশিংটনের আহ্বান নিন্দনীয় ও অমানবিক। এমনকি ২০২৫ সালের জুন মাসেও, যখন ১২ দিনের যুদ্ধ চলছিল, পুতিন রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের সমাধান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে হওয়া উচিত, যুদ্ধের মাধ্যমে এর সমাধান হতে পারে না। রাশিয়ার এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশটি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত এবং শান্তি প্রচেষ্টায় কোনও সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়নি।