কসবা হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ্যে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুক্রবার রাতে আদর্শ লোসাল্কাকে খুনের পর তাঁর দুটি মোবাইল ফোন ও এটিএম কার্ড নিয়ে চম্পট দিয়েছিল অভিযুক্ত ধ্রুব মিত্র এবং কমল সাহা। তারা দুজনে লিভ–ইন পার্টনার৷ আদর্শর এটিএম কার্ড হাতিয়ে পিন নম্বর বদলে ১১ হাজার টাকাও তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত দুই অভিযুক্তই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করে। পুলিশ আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য ধ্রুব ও কমলকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ধ্রুব নদীয়ার বাসিন্দা। কমলের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর এলাকায়। দুজনেই দমদমে এক জায়গায় থাকত।
২১ নভেম্বর রাতে কসবার ওই হোটেলে দুটি রুম বুক করেন আদর্শ। তাঁর সঙ্গে ছিল ধ্রুব মিত্র ও কমল সাহা। ধ্রুব আদর্শের পূর্বপরিচিত। কমল সাহা নামের তরুণীর সঙ্গে আলাপ ছিল না আদর্শ। গভীর রাতে ধ্রুব এবং কমল হোটেল থেকে বেরিয়ে যায়। পরের দিন আদর্শ বিবস্ত্র দেহ উদ্ধার হয়। তাংর পা বাঁধা ছিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেছে, শ্বাসরোধ করে আদর্শকে খুন করা হয়। তাঁর পাকস্থলীতে অ্যালকোহল পাওয়া গেছে।
আদর্শর ব্যাগ থেকে দেড় হাজার নগদ টাকা ও ব্যাঙ্কের এটিএম কার্ড হাতিয়ে গভীর রাতে হোটেল থেকে বেরিয়ে যায় ধ্রুব ও কমল। রাতেই উল্টোডাঙার একটা এটিএমে পাসওয়ার্ড বদলে ১১ টাকা তোলে। আদর্শের ফোন লক থাকায় সিম কার্ড খুলে নিজেদের ফোনে লাগায় অভিযুক্তরা। তারপর ওটিপি দিয়ে এটিএমের পিন বদল করে। এরপর ট্রেন ধরে দুজনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। প্রথমে তারা নদীয়ার কৃষ্ণনগরে যায়। তারপর সেখান থেকে কল্যাণী। তারপর দমদমে চলে আসে। ধ্রুব ও কমলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধ্রুব ও কমল দুজনেই স্বীকার করেছে, খুনের কথা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পরিচিত একজনের পরামর্শে শেষপর্যন্ত দুজনে রবিবার কসবা থানায় গিয়ে আত্মসমর্পন করে। এরপরি পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। এরপরই শুরু হয় ম্যারাথন জেরা পর্ব। দুজনকে জেরা করে একাধিক তথ্য উঠে এসেছে। সবই যাচাই করে দেখা হচ্ছে। সোমবার দুজনকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক তাদের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ অশ্লীল ভাষায় নওশাদ সিদ্দিকীকে আক্রমণ শওকত মোল্লার, শালীনতা বজায় রেখে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ভাঙড়ের বিধায়কের
পুলিশ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছে, হোটেলে ঢুকে তিনজনই মদ্যপান করেছিল। একটা অ্যাপের মাধ্যমে খাবারের অর্ডার দিয়েছিলেন আদর্শ। পরে তাদের মধ্যে টাকা নিয়ে অশান্তি হয়। তিনজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এরপর পা বেঁধে আদর্শকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। পুলিশের দাবি, হোটেলের ঘরে ধস্তাধস্তির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে৷ ঘরের মধ্যে জিনিসপত্র ও খাবার–দাবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল৷ আদর্শের শরীরে বেশ কিছু আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গিয়েছে৷
কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ) রূপেশ কুমার জানিয়েছেন, একটা অ্যাপের মাধ্যমে অভিযুক্তদের সঙ্গে ২০ নভেম্বর আলাপ হয়েছিল আদর্শর। ২১ নভেম্বর দুজনকে ওই হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ২২ নভেম্বর সেই হোটেলের ঘর থেকে উদ্ধার হয় আদর্শের দেহ। যে অ্যাপের মাধ্যমে আদর্শের সঙ্গে তরুণীর আলাপ হয়েছিল, তা নিজের মোবাইল থেকে আদর্শ ডিলিট করে দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রূপেশ কুমার বলেন, ‘একটা ডেটিং অ্যাপে যুবতী কমল সাহার সঙ্গে আদর্শের পরিচয় হয় ২০ নভেম্বর৷ তারপর তারা দেখা করার জন্য ২১ নভেম্বর রাত সাড়ে ন’টায় কসবার হোটেলে রুম ভাড়া নেয়। দুটি রুম ভাড়া করেছিল আদর্শ। এরপর রাতে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করা হয়৷ তিনজনে মিলে পার্টি করে। পার্টি চলাকালীন তিনজনের মধ্যে অশান্তি হয়। ধস্তাধস্তির জেরে আদর্শ পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারায়। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন ধ্রুব এবং কমল৷ এরপর তারা মৃতের ওয়ালেটে থাকা দেড় হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও এটিএম কার্ড নিয়ে শুক্রবার রাত ২টো নাগাদ হোটেল থেকে বেরিয়ে যায়।’ খুনের কারণ সম্পর্কে এখনও কোনও তথ্য পুলিশের হাতে আসেনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতদের বয়ানে অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে৷