বাংলা সাহিত্য জগতে ইন্দ্রপতন। মারা গেলেন প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বাংলার পাঠককূলের কাছে যিনি শংকর নামে পরিচিত ছিলেন। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। বার্ধক্যজনিক কারণে দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। কিছুদিন আগে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শুক্রবার শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। শংকরের প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গতবছর ডিসেম্বরে বাড়িতে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল শংকরের। সেই সময় তাঁকে একটা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কোমরে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে ১৫ দিন আগে এক বেসরকারি হাসপাতালে আবার ভর্তি হন। খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্রমশ তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও আর চিকিৎসায় সাড়া দেননি। এরপর শুক্রবার তাঁর জীবনাবসান ঘটে ৷
১৯৩৩ সালে অবিভক্ত বাংলার বনগাঁয় জন্ম সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের। অল্প বয়সেই বাবাকে হারান। তারপর বেশ কিছু বছর পরিবার নিয়ে হাওড়ায় বসবাস করেন। পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। প্রথমে কেরানি এবং তারপর হকারের কাজও করেছেন। কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টারের হয়েও কাজ করেছেন তিনি। সেই সমস্ত অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেছেন ‘কত অজানারে’ উপন্যাসে।
তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু ১৯৫৫ সালে। তাঁর প্রথম বই ‘কত অজানারে’ তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। শংকরের বাস্তব জীবনঘনিষ্ঠ কাহিনী, সহজ অথচ গভীর ভাষা প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের প্রিয় হয়ে উঠেছিল। সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবনের টানাপড়েন নিয়ে লিখেছিলেন ‘চৌরঙ্গী’। ‘চৌরঙ্গী’, ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জনঅরণ্য’, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে । তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ।
‘চৌরঙ্গী’ প্রকাশের পর শংকর পাঠককূলের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠেন। কলকাতার হোটেল জীবনের অন্তরাল কাহিনী, মানুষের সাফল্য–ব্যর্থতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভাঙনের গল্প, সব মিলিয়ে এই উপন্যাস তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তাঁর চারটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ পরিচালনা করেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান।
শংকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সাহিত্যজগৎ। শোকপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের (শংকর) প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটা উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল। ‘চৌরঙ্গী’ থেকে ‘কত অজানারে’, ‘সীমাবদ্ধ’ থেকে ‘জনঅরণ্য’, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তাঁর লেখনীর আধারে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর সুগভীর গবেষণা ও গ্রন্থসমূহ আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাঁর প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’