মারা গেলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুকুল রায়। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। রবিবার রাত ১টা ৩০ মিনিট নাগাদ সল্টলেকের অ্যাপোলো হাসপাতালে তিনি মারা যান। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এই বর্ষীয়ান তৃণমূল কংগ্রেস নেতা। দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার রাতে মারা যান মুকুল রায়।
যুব কংগ্রেসে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন মুকুল রায়। পরবর্তীকালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং দীর্ঘদিন ধরে মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। মমতা তাঁকে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লিতে তৃণমূলের একজন বিশিষ্ট মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০০৬ সালে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত উচ্চকক্ষে দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি মুকুল রায় সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুজনই যুব কংগ্রেসে একসঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। মমতা যখন দল গঠন করেন, তখন তিনি মুকুল রায়কে সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করেন এবং দলের মুখ হিসেবে দিল্লিতে পাঠান। এর পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মুকুল রায়কে। দিল্লির রাজনীতিতে মুকুল দলের একজন বিশিষ্ট মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০০৬ সালে তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সংসদে দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইউপিএ–২ সরকারের সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পান মুকুল রায়। প্রথমে তিনি জাহাজ চলাচল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ২০১২ সালের মার্চ মাসে রেলমন্ত্রী হন। বাংলার রাজনীতিতে কৌশলগত দক্ষতার কারণে মুকুল রায়কে ‘চাণক্য’ বলে ডাকা হত। রাজ্যের প্রতিটি কোণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুকুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মুকুল রায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মুকুল রায়কেও অত্যন্ত সম্মান করেন।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মুকুল রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর ফলে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। তৃণমূল কংগ্রেসের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন মুকুল রায়ের আমলে বিপুল সংখ্যক সিপিএম এবং কংগ্রেস নেতা দলত্যাগ করেন। তিনি বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট কংগ্রেস এবং বাম নেতাকে তৃণমূলে যোগদানে সহায়তা করেছিলেন। পরে দলীয় কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিরোধের কারণে ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিজেপিতে যোগ দেন মুকুল রায়।
মুকুল রায় বিজেপিতে যোগদান করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিলেন।
২০১৭ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদানের পর মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসকে তার মর্যাদা উপলব্ধি করিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বাংলায় ১৮টি লোকসভা আসন জিতেছিল। এই নির্বাচনে মুকুল রায় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের মূল ভোটারদের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট তৃণমূল নেতাকে বিজেপিতে আনার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপি–র টিকিটে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং জয়লাভ করেন।
২০২১ সালের জুন মাসে বিজেপি ছেড়ে আবার তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন মুকুল রায়। তিনি যখন ফিরে আসেন, খোলা মনে স্বাগত জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে মুমকুল রায়কে বিধায়ক হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করেন। এই সময়ে মুকুল স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। গত দুই বছর ধরে কোনও দলীয় সভায় যোগ দেননি। এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন য়ে, কাউকে চিনতে পারতেন না।