শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দিতে যাচ্ছিলেন ভোলানাথ ঘোষ। সঙ্গে ছিলেন ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ। আদালতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে তাঁদের গাড়ি। ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ। নিহত গাড়ির চালক শাহানুর আলমও। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছেন শেখ শাহজাহান মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষ। যদিও তাঁর আঘাত যথেষ্ট গুরুতর। ভোলানাথের পরিবারের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষী হওয়ার জন্যই জেলে বসে ভোলানাথকে খুনের ষড়যন্ত্র করেছে শেখ শাহজাহান।
দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বাসন্তী হাইওয়েতে। বাড়ি থেকে বসিরহাট আদালতে সাক্ষী দিতে যাচ্ছিলেন ভোলানাথ ঘোষ। ন্যাজাটের কাছে বাসন্তী হাইওয়ের বয়ারমারি পেট্রোল পাম্পের সামনে তাঁদের গাড়িকে সামনে থেকে ধাক্কা মারে একটা লরি। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ছিল যে চার চাকা গাড়িটির সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায়। দুটি গাড়িই পাশের নয়ানজুলিতে গিয়ে পড়ে। গাড়ির পেছনের সিটে বসে ছিলেন ভোলানাথ। সামনের সিটে চালকের পাশে বসে ছিলেন ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ। পেছনের সিটে থাকায় বেঁচে যান ভোলানাথ। তাঁর ছেলে সত্যজিৎ ও গাড়ির চালক ঘটনাস্থলেই মারা যান।
দুর্ঘটনার পরপরই লরির চালক আব্দুল হালিম মোল্লা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। কয়েকজন অভিযোগ করেছে, আব্দুল হালিম মোল্লা একজনের বাইকে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। কয়েকজন তাকে পালাতে সাহায্য করে। আশপাশে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় দুর্ঘটনাস্থলের ফুটেজ পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পুলিশকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে বসিরহাট জেলা পুলিশ। বসিরহাট জেলা পুলিশের পদস্থ এক কর্তা বলেন, ‘পারিপার্শ্বিক সমস্ত তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পেছনে কোনও ষড়যন্ত্র আছে কি না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনাগ্রস্ত দুটি গাড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা হবে।’ গাড়ি দুটি নয়ানজুলি থেকে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
বুধবার বসিরহাট আদালতে শেখ শাহজাহানের মামলা ছিল। এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন এই ভোলানাথ ঘোষ। এদিন সকালে সরবেড়িয়া থেকে গাড়িতে করে আদালতে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে ভোলানাথ ছাড়াও তাঁর ছোট ছেলে এবং ওই গাড়ির চালক ছিলেন। গাড়িটি বয়ারমারি থেকে মালঞ্চর দিকে যাচ্ছিল। উলটো দিক থেকে একটা খালি লরি মালঞ্চ থেকে বয়ারমারির দিকে আসছিল। সেই সময় বাসন্তী হাইওয়েতে একটা পেট্রল পাম্পের সামনে ভোলানাথের গাড়িতে ধাক্কা মারে লরিটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ভোলানাথের ছোট ছেলে সত্যজিৎ ও গাড়ির চালক শাহানুরের।
আরও পড়ুনঃ বিধায়কের বেতন ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার! দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ, ওড়িশার বিজেপি সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত
আরও পড়ুনঃ শ্রীনগরে গণ সংঘর্ষের মামলায় প্রায় ৩০ বছর পর জেকেএলএফ নেতা জাভেদ মীরকে গ্রেফতার করল জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ
আহত অবস্থায় ভোলানাথকে গাড়ি থেকে উদ্ধার করে প্রথমে মিনাখাঁ গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বুকে চোট থাকায় পরে সেখান থেকে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ভোলানাথকে তাঁর ছেলের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। আহত ভোলানাথ বলেন, ‘আদালতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। সবে বয়ারমারি পার হয়েছি, এমন সময় মালঞ্চর দিক থেকে আসা একটা লরি সজোরে এসে ধাক্কা মারে গাড়িতে। গাড়িটি নয়ানজুলিতে পড়ে যায়। অচৈতন্য অবস্থায় আমাকে সেখান থেকে লোকজন উদ্ধার করে। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল তা প্রশাসন তদন্ত করে দেখুক। এটা পরিকল্পিত ঘটনা হতে পারে।’
ভোলানাথের বড় ছেলে বিশ্বজিৎ ঘোষ শাহজাহান ঘনিষ্ঠ দুই তৃণমূল নেতা–নেত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘শাহজাহান শেখের কথায় মোসলেম শেখ ও সবিতা রায় চক্রান্ত করে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। শাহজাহান শেখ জেলে বসেই সমস্ত কলকাঠি নাড়ছে। আগেও সে বিভিন্ন সময়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। শাহজাহানের অবর্তমানে এখন ন্যাজাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সবিতা রায় ও পঞ্চায়েত সমিতির সহ–সভাপতি মোসলেম শেখ দাপট দেখাচ্ছে। এরা শাহজাহানের র্যাকেট চালাচ্ছে।’
ভোলানাথ এক সময় শাহজাহানের সঙ্গী ছিলেন। পরে অনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ বাধে। এক সময় শাহজাহানের রোষের মুখে পড়তে হয় ভোলানাথকে। তাঁর বাড়ি ভাঙচুর করে এলাকা ছাড়া করা হয়। শাহজাহান গ্রেফতার হওয়ার পর এলাকায় ফেরেন ভোলানাথ। শাহজাহানের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন। সিবিআইয়ের দায়ের করা এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথেই বুধবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ভোলানাথের গাড়ি।