রোগটা নতুন নয়। বেশ পুরনো। ঘরের মাঠে ঘূর্ণি উইকেট বানাও। তারপর বিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের দিকে স্পিনার লেলিয়ে দাও। ব্যস, দুরন্ত ঘূর্ণি, এই লেগেছে পাক। স্পিনের ভেল্কিতে কুপোকাত হয়ে একে একে সবাই প্যাভিলিয়নের পথে হাঁটা দেবে। এই ফর্মুলায় দেশের মাঠে কত টেস্ট, কত সিরিজ যে আমরা জিতেছি!
বেচারা গৌতম গম্ভীর। তাঁর আর দোষ কোথায়! মহাজ্ঞানী জন যে পথে করেন গমন, তিনিও সেই পথেই হেঁটেছেন। পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তিনি বলতেই পারেন, সব পাখি মাছ খায়, দোষ হয় মাছরাঙার।
তফাতটা হল, সেদিন ভারত বিদেশের মাটিতে হারলেও দেশের মাটিতে হেঁসেখেলে টেস্ট জিতত, সিরিজ জিতত। আজ বিদেশের মাটিতে, সবুজ উইকেটে তবু লড়াই করা যাচ্ছে। কিন্তু দেশের মাটিতে মাথা নিচু করেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। তফাতটা কোথায়? সেই মানের স্পিনার নেই? স্পিনার কি কম পড়িয়াছে? এটা ঘটনা, অনিল কুম্বলে, হরভজন সিংদের সঙ্গে ওয়াশিংটন সুন্দর, অক্ষর প্যাটেলদের তুলনা অনেকটা সাতের দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতোই। আসল কারণ হল, স্পিনার তেমন কম পড়ে নাই, বরং স্পিন খেলার লোক কম পড়িয়াছে।
তখন ভারত জিতত, তার বড় কারণ ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা স্পিন খেলতে জানতেন। আব্দুল কাদির, শেন ওয়ার্ন, মুরলিথরণের মতো কিংবদন্তিরাও ভারতীয় ব্যাটারদের কাছে তেমন ত্রাস হয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু এখন মাঝারি মানের স্পিনাররাও কিনা লেজে গোবরে করে ছাড়ছেন। টেস্ট খেলার প্রথম শর্ত হল ধৈর্য। কিন্তু আইপিএলের আবহে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মের ধৈর্যের বড়ই অভাব। টানা তিনটি বা চারটি বল ডিফেন্স করলেই যেন হাত নিসপিস করে। মনে হয়, কখন ছক্কা হাঁকাব। নিন্দুকেরা বলেন, এখন ভারতীয়দের উইকেট কষ্ট করে আর নিতে হয় না। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা সত্যিই অতিথি পরায়ণ। তাঁরা বোলারদের কষ্ট দিতে চান না। তাই, কয়েক ওভার খেলেই উইকেট উপহার দেন।
সত্যিই তো, ব্যাটসম্যানরা যদি সাধারণ স্পিনটুকু খেলতে না পারেন, তাহলে গৌতম গম্ভীর কীই বা করবেন! ইডেনে হাতে তিন দিন বাকি। তুলতে হবে মাত্র ১২৪ রান। তবু সকলের কী তাড়া! যেন বিমান স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ম্যাচ শেষ করেই উঠে পড়তে হবে। টি২০ তেও যদি এই রান তুলতে হত, তাহলেও ব্যাটসম্যানরা হয়তো এতখানি বেপরোয়া হতেন না। কিন্তু এখানে ‘কেবা আগে প্রাণ/করিবেক দান/তারি লাগি তাড়াতাড়ি।’
আরও পড়ুনঃ সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের লজ্জা, ঘরের মাঠে আবার ধবলধোলাই ভারত, ২–০ সিরিজ জয় দক্ষিণ আফ্রিকার
এখানেই কোচের ভূমিকা। তিনি কী চাইছেন, সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া। কী চাইছেন না, সেটা আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া। ঘরের মাঠে অধিনায়ক, কোচেরা পছন্দের উইকেট চেয়েই থাকেন। কিন্তু কিউরেটরের ওপর এমনভাবে চাপ তৈরি করেন না। একসময় নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলে গেছেন বলে ভেবে নিয়েছেন ইডেন তাঁর মামার বাড়ি। কেউ পিচের ওপর হামাগুড়ি দিলেন, কেউ শুয়ে পড়লেন। যেন কতই না পিচ বোঝেন! যেখানে সৌরভ গাঙ্গুলির মতো মানুষ ইডেনের দায়িত্বে, সেখানে এত পাকামি বা এত বাহাদুরি করতে নেই, এই বোধটুকুও নেই।
টেস্টে সীমাহীন ব্যর্থতার প্রসঙ্গ উঠলেই কেউ কেউ শিয়ালের কুমিরছানা দেখানোর মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, টি২০ এশিয়া কাপের কথা টেনে আনেন। কী জানি, ঘরের মাঠে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ হারানোর ঘটনাকেও হয়তো বিরাট করে দেখানো হবে। লাল বল আর সাদা বলের ঘরানায় যে আকাশ–পাতাল তফাত, এই সহজ সত্যিটা গম্ভীরবাবুকে কে বোঝায়! ইডেনে ব্যাটসম্যানেরা যেভাবে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন, গুয়াহাটিতেও সেই রোগ সারল না। যে যাঁর মতো আসছেন, উইকেট ছুঁড়ে চলে যাচ্ছেন। যাঁর সবথেকে বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার কথা, সেই অধিনায়ক ঋষভ পন্থ যেন সবথেকে বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়ার মহান দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছেন।
যাঁকে পারছেন তিন নম্বরে পাঠাচ্ছেন, আবার পরের ম্যাচেই একলাফে আট নম্বরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কাউকে কিলিয়ে কাঠাল পাকানোর মতো জোর করে অলরাউন্ডার বানাতে চাইছেন। তিনি বলছেন, কিউরেটরের দোষ নেই, এমন উইকেটই আমরা চেয়েছিলাম। আবার ব্যাটিং কোচ এসে বলে যাচ্ছেন, এটা কোচের মনের কথা নয়। তিনি মোটেই এমন উইকেট চাননি। কে যে সত্যি বলছেন, বোঝা মুশকিল।
এমন কতকিছুই গুলিয়ে যায়। এমন কতকিছুই গুলিয়ে যাওয়ার সময়। ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ০–৩ হার। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধেও হোয়াইটওয়াশ। তারপরেও সমালোচনা করা যাবে না। করলেও মেপে করতে হবে। যদি প্রভুরা রেগে যান!