প্রত্যাশা চাপ না থাকলে একটা ম্যাচ কোন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে দেখিয়ে দিয়ে গেল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। দুই দলই বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে মার্কিন মুলুকে পৌঁছেছিল। বিশেষজ্ঞদের ফেবারিটের তালিকায় ছিল ফ্রান্স। সেমিফাইনালে হেরে বিশ্বজয়ের স্বপ্নভঙ্গ দুই দলেরই। লড়তে হয়েছিল তৃতীয় স্থানের জন্য। ছিল না কোনও প্রত্যাশা চাপ। শুধু মনের আনন্দে খেলা। আর সেই ম্যাচ পৌঁছে গেল অন্য উচ্চতায়। ১০ গোলের রেকর্ড। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬–৪ ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করল ইংল্যান্ড। দুরন্ত হ্যাটট্রিক বুকায়ো সাকার। ম্যাচে জোড়া গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসির ওপর চাপ বাড়িয়ে দেন কিলিয়ান এমবাপে।
ম্যাচের প্রথমার্ধ যদি হয় ইংরেজদের শাসন। দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি ভীতি গ্রাস করেছিল ইংল্যান্ডকে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে এক গোলে এগিয়ে থেকেও এই ভীতিই টমাস টুখেলের দলকে খেতাবি লড়াইয়ের স্বপ্ন থেকে ছিটকে দিয়েছিল। তৃতীয় স্থানের ম্যাচে প্রথমার্ধে ৪ গোলে এগিয়ে থেকেও সেই ভীতিই গ্রাস করল ইংল্যান্ডকে। ফলস্বরূপ ৪ গোল হজম। যদিও ১৯৬৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে বিশ্বকাপে ৬৬ বছরের ইতিহাসে সেরা সাফল্য এদিনই পেয়ে গেল ইংল্যান্ড। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অবস্থা।
কেন ম্যাচে এত গোলের বন্যা? আসলে খেতাব জয়ের স্বপ্ন বিলীন হয়ে যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ফুটবলাররা। মাঠে নামার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেন। ইল্যান্ড–ফ্রান্স ম্যাচেও সেটাই হয়েছিল। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন, জুড বেলিংহামরা যেমন খেলতে চাননি। আক্রমণভাগের এই দুই সেরা তারকাকে বাইরে রেখেই প্রথম একাদশ সাজাতে হয়েছিল ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলকে। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁ দ্বিতীয় সারির রক্ষণ নিয়ে প্রথম একাদশ সাজিয়েছিলেন। ফলে প্রথমার্ধেই ৪ গোল হজম।
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ম্যাচের শেষদিকে টমাস টুখেলের রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এদিন শুরু থেকেই অন্য মেজাজে ইংল্যান্ড। চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক। প্রথম থেকেই ঝড় তুলে ৩ মিনিটের মধ্যেই এগিয়ে যাওয়া। বক্সের বাইরে থেকে দুরন্ত শটে গোল ডেকলান রাইসের। ১৮ মিনিটে হেডে এজেরি কনসার দ্বিতীয় গোল। তখন ইংল্যান্ডের সাঁড়াশি আক্রমণের চাপে ভেঙে পড়েছে ফরাসি রক্ষণ দূর্গ। বুকায়ো সাকাকে সামলাতে নাজেহাল অবস্থা ফ্রান্স রক্ষণের। ৩৭ মিনিট ও প্রথমার্ধের সংযুক্তি সময়ের ১ মিনিটের মাথায় জোড়া গোল করে ৪–০ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন সাকা। ফ্রান্সকে দেখে তখন মনে হচ্ছিল, স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে হারের ঘোর তখনও কাটেনি।
কিলিয়ান এমবাপেরও হয়তো মনে ছিল না, ইংল্যান্ডের জাসে একবার বল ঢোকাতে পারলেই স্পর্শ করবেন মেসির বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। দিদিয়ের দেশঁও হয়তো বিরতিতে রেকর্ডের কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে এমবাপে। ৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের পাস থেকে বাঁপায়ের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোল। মেসিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন গোল্ডেন বুটের দিকে। স্পর্শ মেসির সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ফ্রান্সের খেলা দেখে তখন মনে হচ্ছিল সেমিফাইনালে হারের ঘোর কেটে গেছে। ৫৪ মিনিটে এমবাপের পাস থেকে বারকোলার গোলে ৪–২।
অবশেষে ম্যাচের ৬৬ মিনিটে এল সেই মহেন্দ্রক্ষণ। মাইকেল ওলিসের পাস থেকে এমবাপের গোল। গোল্ডেন বুটের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এককভাবে বিশ্বকাপে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের (২২) মালিক। পেছনে ফেলে দিলেন লিওনেল মেসিকে (২১)। নাটকীয়ভাবে ফ্রান্সের ম্যাচে ফিরে আসায় ইংল্যান্ডকে হয়তো আবার হারের আতঙ্ক গ্রাস করেছিল। আর্জেন্টিনা ম্যাচের মতো ভুল না করে আরও আক্রমণাত্মক ইংল্যান্ড। ৮৪ মিনিটে জেড স্পেনসকে বক্সে ফাউল করেন ফরাসি ডিফেন্ডার মাতো গাস্তো। পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। পেনাল্টি থেকে গোল করে বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিক। ইংল্যান্ডের ব্যবধান বেড়ে ৫–৩।
তখনও ম্যাচের চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স বাকি। গোলের উৎসব দেখে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকতে মন চায়নি জুড বেলিংহামের। ৭৮ মিনিটে এবেচেরি এজের জায়গায় তাঁকে মাঠে নামান টমাস টুখেল। গোলের খাতায় নাম লেখান বেলিংহামও। তাঁর আগে অবশ্য সংযুক্তি সময়ের ৬ মিনিটে উসমান ডেম্বেলের গোলে ব্যবধান কমিয়ে ৫–৪ করে ফেলে ফ্রান্স। তার ঠিক ২ মিনিট পরেই বেলিংহামের গোলে ৬–৪। ভেঙে গেল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। আগের রেকর্ড ছিল ১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের ৬–৩ গোলে জয়। সেদিন ফ্রান্স জিতেছিল, আর এদিন হার। কলঙ্কজনক অধ্যায়ে শেষ হল দিদিয়ের দেশঁ–র দেশের হয়ে কোচিং জীবন।