বিদেশি দলের বিরুদ্ধে বরাবরই ভাল খেলার ঐতিহ্য আছে ইস্টবেঙ্গলের। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু–র গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখল লাল–হলুদ ব্রিগেড। বিশ্বকাপার সমৃদ্ধ জর্ডনের আল হুসেনের বিরুদ্ধে দুরন্ত ফুটবল উপহার দিল। আক্ষেপের বিষয়, প্রথমার্ধে ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েও নিশ্চিত জয় হাতছাড়া। দ্বিতীয়ার্ধে অতি রক্ষণাত্মক হতে গিয়েই মাশুল গুনতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে।
জর্ডনের ফুটবলের মান ভারতের থেকে অনেক এগিয়ে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের স্থান ১৩৮ নম্বরে। সেখানে জর্ডন রয়েছে ৭৩ নম্বরে। এশীয় ক্লাব র্যাঙ্কিংয়েও জর্ডনের আল হুসেন ইস্টবেঙ্গলের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। আল হুসেন রয়েছে ৬৮ নম্বরে। অন্যদিকে, ইস্টবেঙ্গল রয়েছে ১১৩ নম্বরে। তার ওপর আল হুসেনে রয়েছেন ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলা ৪ ফুটবলার। এছাড়াও রয়েছেন বেশ কয়েকজন জাতীয় দলের ফুটবলার। এইরকম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের কাছে লড়াই ছিল অসম প্রতিযোগিতা।
কারণ, অনেকটা দুর্বল দল নিয়েই আম্মান গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। দলে চোট–আঘাত ও ফিটনেসের সমস্যা ছিল। চোটের শেষ মুহূর্তে আম্মানগামী দল থেকে ছিটকে যান বিদেশি স্ট্রাইকার ক্রিস ইকোনোমিডিস। পাসপোর্ট সমস্যা ছিল ডিফেন্ডার লালচুংনুঙ্গার। বিদেশি স্ট্রাইকার এফিয়ং কলতাতা এসে পৌঁছতে পারেননি। আর এক বিদেশি একে লোবা ইস্টবেঙ্গল আম্মান পৌঁছানোর পর কলকাতায় পৌঁছন। মোহাম্মদ রশিদ পিঠের ব্যথার কারণে আম্মান যাওয়ার আগে দু’দিন অনুশীলনই করতে পারেনি। দানি রামিরেজেরও ফিটনেস সমস্যা ছিল। এত সব প্রতিকূলতা নিয়েই আল হুসেনের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল। যদিও খেলায় তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
তিন বিদেশি মোহাম্মদ রশিদ, ডানি রামিরেজ, সদ্য দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া ক্রোয়েশিয়ান ডিফেন্ডার জিবুলিচ এবং ঘরের ফুটবলারদের ওপর ভরসা রেখে আল হুসেন ম্যাচের দল সাজিয়েছিলেন আন্তেনিও লোপেজ হাবাস। ভরসা ছিল বিদেশি দলের বিরুদ্ধে ভাল খেলার ঐতিহ্য। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিদেশি দলের বিরুদ্ধে ঈর্ষণীয় সাফল্য আছে ইস্টবেঙ্গলের। অতীতে এশিয়া নামী দলকে হারিয়ে আসিয়ান কাপ জিতেছিল। এছাড়া হারিয়েছে ইরানের পাস ক্লাব, উত্তর কোরিয়ার পিয়ং ইয়ং, ইরাকের আল জাওরা, জাপানের কাওসাকি ভার্দি, থাইল্যান্ডের বেকতেরো সাসানার মতো দলকে। তালিকায় সদ্য সংযোজন হয়েছে কুয়েতের আল আরবি। আল আরাবিকে যুবভারতীতে ৪–১ গোলে হারিয়েই এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টু–র মূল পর্বে উঠেছে ইস্টবেঙ্গল। সেই ম্যাচ ও ডুরান্ড কাপ জেতার আত্মবিশ্বাস নিয়েই বুধবার জর্ডনের আম্মান স্টেডিয়ামে আল হুসেনের মুখোমুখি হয়েছিল লাল–হলুদ ব্রিগেড।
যুবভারতীতে সীমিত শক্তি নিয়েও কুয়েতের আল আরবির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আক্রমণে ঝাঁপিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। আল হুসেনের বিরুদ্ধে অবশ্য রক্ষণ মজবুত করে আক্রমণে ঝাঁপিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। রক্ষণে আনোয়ার, হার্দিক, সন্দীপ মাণ্ডির ও জিভুলিচের সঙ্গে জয় গুপ্তাকে জুড়ে দিয়েছিলেন হাবাস। জয় গুপ্তার কাজ ছিল আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণকেও সাহায্য করা। শুরু থেকেই আক্রমণে ঝাঁপিয়ে প্রতিপক্ষকে কোনঠাসা করে দেয় ইস্টবেঙ্গল। ৯ মিনিটে গোল করে এগিয়েও যায় লাল–হলুদ ব্রিগেড। মোহাম্মদ রশিদের কাছ থেবে বল পেয়ে এডমুন্ড লালরিনডিকা গতি বাড়িয়ে বক্সে ঢুকে পড়ে জোরালো শট নেন। আল হুসেনের গোলকিপার আবুলাইলা আংশিক প্রতিহত করলে ফিরতি বল চলে আসে রামিরেজের কাছে। নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান রামিরেজ।
পিছিয়ে পড়ে মরিয়া হয়ে ওঠে আল হুসেন। ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা আরও বেশি উজ্জীবিত হয়ে খেলতে শুরু করে। তার মধ্যেই ১৯ মিনিটে সমতা ফেরানোর সুযোগ এসেছিল আল হুসেনের সামনে। পেদ্রো হেনরিকের হেড হোল লাইন থেকে বাঁচান প্রভসুখন গিল। ৩৮ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ এসেছিল এডমুন্ডের সামনে। একা গোলকিপারকে পেয়েও বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন। রক্ষণাত্মক খোলসে গুটিয়ে না গিয়ে আল হুসেনের ওপর আক্রমণের চাপ বাড়ান ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা। তার সুফল মেলে ৪০ মিনিটে। রামিরেজের কর্নারে ভেসে আসা বল বক্সের মাঝে আল হুসেন গোলকিপার দখলে নেওয়ার আগেই হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন আনোয়ার।
বিরতিতে ২–০ গোলে এগিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণের ঝাঁজ বজায় থাকলেও আল হুসেনের ফুটবলাররা মরিয়া হয়ে ওঠেন। ৬১ মিনিটে লাল–হলুদ রক্ষণের ভুলে গোল পেয়েও যায়। মামুদ আলদীব ইস্টবেঙ্গল বক্সের বাঁদিকে বল কেড়ে নিয়ে বাড়িয়ে দেন আল মারদির উদ্দেশ্যে। আল মারদি বল ধরে ইস্টবেঙ্গলের রশিদকে টপকে ব্যবধান কমান। এই গোল বাড়তি অক্সিজেনহ জোগায় আল হুসেনকে। দ্বিতীয় গোলের জন্য চাপ বাড়ায়। শেষ ১৫ মিনিট আক্রমণের চাপে ইস্টবেঙ্গল রক্ষণের জমাট ভাব নষ্ট হয়ে যায়। সেই সুযোগে ৮৭ মিনিটে সমতা ফেরায় আল হুসেন। বদলি হিসেবে মাঠে নামা ওবেদা আল নামারনার সেন্টার থেকে আহমেদ আসাফ গোল করে ইস্টবেঙ্গলের মুখের গ্রাস কেড়ে নেন।