ম্যাচের বয়স তখন ৬ মিনিট। ঝলসে উঠেছিল লিওনেল মেসির বাঁ পা। জিনেদিন জিদানপুত্র লুকা জিদানের দুপায়ের ফাঁক দিয়ে বল আলজেরিয়ার জালে। অফসাইডের জন্য গোল বাতিল। তবে ম্যাচের শুরুতেই ইঙ্গিতটা ছিল, দিনটা মেসির। তাঁর দুরন্ত হ্যাটট্রিকে চূর্ণ আলজেরিয়া। আলজেরিয়াকে ৩–০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের মতোই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল আর্জেন্টিনা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই শুরু করলেন লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। ১৬ গোল করে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে মেসি।
প্রায় একসপ্তাহ হতে চলল, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপ যেন ম্যাড়মেড়ে মনে হচ্ছিল। ব্রাজিল মাঠে নেমেছে, স্পেন, পর্তুগাল, জার্মানি, এমনকি ফ্রান্সও। তাতেও ফুটবলপ্রেমীদের মনে শান্তি ছিল না। অপেক্ষায় ছিলেন মেসির জন্য। হ্যাঁ, বুধবারই শুরু হল আসল বিশ্বকাপ। মেসির আর্জেন্টিনা মাঠে নামায়। এদিন দেশের জার্সিতে ২০০তম ম্যাচে মাঠে নেমেছিলেন মেসি। মাইলস্টোনের ম্যাচ এভাবে স্মরণীয় করে রাখবেন, কে জানত! বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিকটা পেয়ে গেলেন মাইলস্টোনের ম্যাচেই। এইরকম কৃতিত্ব ফুটবল বিশ্বে আর কজনের আছে? আরও একটা নজির গড়েছেন মেসি। পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ও কুয়েতের কিংবদন্তি বাদের আল–মুতাভার পর তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে দেশের জার্সিতে ২০০তম ম্যাচ খেললেন।
আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপ যাত্রার গল্পে আরও একটা ঐতিহাসিক অধ্যায় যোগ করেন মেসি। বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৬–৬টি বিশ্বকাপ খেলার নজির গড়লেন। আর এই রেকর্ড এমন দিনে গড়লেন, যেদিনই ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে প্রথমবার পা রেখেছিলেন। যদিও ৬টি বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড এককভাবে রাখতে পারবেন না। বুধবার রাতেই মেসির কৃতিত্বে ভাগ বসাবেন পর্তুগাল তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
‘‘মর্নিং শো’ দ্য ডে’’। মেসির ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। শুরুতেই যেভাবে ঝলসে উঠেছিলেন, বোঝা গিয়েছিল দিনটা তাঁরই। ম্যাচের শুরুতেই অফসাইডের জন্য বাতিল হলেও গোল পেতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি মেসিকে। ম্যাচের ১৭ মিনিটেই আবার জ্বলে উঠেছিল মেসির বাঁ পা। নিজেদের অর্ধ থেকে রড্রিগো ডি পলের নেওয়া ফ্রিকিক থেকে মাঝমাঠে বল পেয়েছিলেন মেসি। বল ধরেই সেই ‘ম্যাজিক’ দৌড়। আলজেরিয়ার ডি বক্সের মাথায় পৌঁছে বাঁ পায়ের ‘শেষ পঙ্তি’। বল সামান্য বাঁক নিয়ে জিদানপুত্র লুকা জিদানের আঙুল স্পর্শ করে বল জালে।
দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাচও সেই মেসিময়। ৬০ মিনিটে আবার সেই ‘মেসি ম্যাজিক মোমেন্ট’। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নিয়েছিলেন। বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি আলজেরিয়ার গোলরক্ষক। বল তাঁর হাত থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। আলতো টোকায় গোল করেন মেসি। এই গোলের সঙ্গে সঙ্গে মেসি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনাল্ডো নাজারিওকে। ৬৬ মিনিটেই হ্যাটট্রিক পেয়ে যেতেন মেসি। তাঁর শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বাঁচান জিনেদিন জিদান–পুত্র।
যদিও মেসিকে রেকর্ড গড়া থেকে আটকানো যায়নি। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে দুর্দান্ত এক গোলে আদায় করে নিলেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক। জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে মাঠের মাঝ বরাবর ছুটে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামা নিকো গঞ্জালেসকে বল দেন মেসি। গঞ্জালেস আবার মেসিকে ফিরিয়ে দেন। বক্সের বাইরে থেকে মেসির সেই ট্রেডমার্ক বাঁকানো শট, বল আলজেরিয়ার জালে এবং বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক।
হ্যাট্রটিকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে উঠলেন মেসি। রোনাল্ডো নাজারিওর ১৫ গোল ছাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেললেন সর্বোচ্চ গোল (১৬) করা মিরোস্লাভ ক্লোজেকে। গোলের পরপরই কোচ স্ক্যালোনি যখন তাঁকে তুলে নিলেন, দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে করতালি।