এবারের বিশ্বকাপে একের পর এক চমক চলছেই ছোট দেশগুলির। আগের ম্যাচে শক্তিধর জার্মানির বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচেই গোল করে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছে দেড় লক্ষের জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও। আর এক অভিষেককারী দেশ তো রীতিমতো ছাপিয়ে গেল কুরাসাওকে। বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচেই বিশ্বকাপজয়ী স্পেনকে আটকে দিয়ে ইতিহাস গড়ল ৫ লক্ষ জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। ম্যাচের ফল গোলশূন্য।
কেপ ভার্দের এই ইতিহাস গড়ার পেছনে রয়েছেন গোলকিপার ভোজিনহা। বয়স চল্লিশ। এই বয়সটা ফুটবলারদের বুটজোড়া তুলে রাখার সময়। আর সেই বয়সেই কিনা এমন পারফরমেন্স! গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা যখন স্পেনের একের পর এক শট আটকাচ্ছিলেন, তখন বয়সের তথ্যটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। ম্যাচের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কতটা অপ্রতিরোধ্য ছিলেন ভোজিনহা। কেপ ভার্দের গোল লক্ষ্য করে স্পেন ২৭টা শট নিয়েছে। এরমধ্যে গোলে ছিল ৭টি। ৭টিই অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকেছেন ভোজিনহা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ–বেঞ্জ স্টেডিয়ামের দর্শকরা ভাবেননি দিনটা এইভাবে ইতিহাসে লেখা থাকবে। স্পেনও ভাবেনি অনামী কেপ ভার্দের কাছে প্রথম ম্যাচেই এভাবে আটকে যেতে হবে, যারা এবছরই বিশ্বকাপের আঙিনায় প্রথম পা রেখেছে। তবে এর জন্য স্পেনের স্ট্রাইকারদের যেমন ব্যর্থতা রয়েছে, কৃতিত্ব দিতে হবে কেপ ভার্দের ফুটবলারদের।
স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে এদিন প্রথম একাদশে রাখেননি দুই তরুণতুর্কী লামিনে ইয়ামাল ও উইলিয়ামসকে। হ্যামস্ট্রিংয়ের কারণে ইয়ামাল দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন। সম্ভবত সেই কারণেই ঝুঁকি নেননি। নিরুপায় হয়ে ম্যাচের ৭০ মিনিটে গাভির পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামান। তাতেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। যদিও ম্যাচের আগাগোড়া প্রাধান্য ছিল স্পেনেরই। স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতায় ও কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনহার কৃতিত্বে গোল পায়নি স্পেন।
কুম্ভের মতো স্পেনের একের পর এক গোলের প্রচেষ্টা রুখে গেছেন ভোজিনহা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে পরপর তিনটি সেভ, মিকেল ওয়ারজাবাল, এমেরিক লাপোর্ত এবং ফেরান তোরেসের শট তো অবিশ্বাস দক্ষতায় আটকান ভোজিনিয়া। তিনি যেন জানতেন বল কোথায় যাবে। দ্বিতীয়ার্ধে মিকেল মেরিনো, মার্ক কুকুরেয়া, ইয়ামাল এসেও ভোজিনিয়ার দূর্গ ভেদ করতে পারেননি।
ইয়ামাল ও উইলিয়ামস প্রথম একাদশে না থাকায় উইং দিয়ে স্পেনের আক্রমণ কার্যকরী হচ্ছিল লা। ম্যাচের সময় যত গড়িয়েছে,রড্রি, পেড্রি, টোরেস, ওয়ারজাবাল, গাভিরা দারুণ আক্রমণ তুলে নিয়ে আসছিলেন। তবে কেপ ভার্দের ডিফেন্ডারদের দৃঢ়তায় স্পেন ২৮ মিনিট পর্যন্ত গোলের মুখে খুলতে পারেননি। ২৯ মিনিটে গোল করার একটা হাফ চান্স এসেছিল। কুকুরেলার ব্যাক পাস গাভির পায়ে এলে, তিনি জোরালো শট নিয়েছিলেন গোল লক্ষ্য করে। সেই শট কেপ ভার্দে ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে ফিরলে, আলগা বলে কুকুরেলার শট ক্রশপিসের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যায়। তোরেসের একটা শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকান ভোজিনহা। ৪০ মিনিটে কুকুরেলার হেডে উড়ে আসা বল বক্সের মাঝে পেয়ে টোরেস জোরালো শট নিলে, তা ক্রশপিসে লেগে প্রতিহত হয়। আলগা বল চলে এসেছিল ওয়ারজাবালের পায়ে। তাঁর শট গোলে ঢোকার মুখে দুরন্ত তৎপরতায় ফিস্ট করে ক্রশপিসের ওপর দিয়ে বের করে দেন ভোজিনহা।
দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন আক্রমণের ঝাঁজ বাড়ালেও কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণ ভেঙে গোল পায়নি। হার মানাতে পারেনি তাদের গোলকিপার ভোজিনহাকে। তাতেই স্পেন কোচ ফুয়েন্তে গাভির বদলি হিসেবে নামান ইয়ামালকে। তিনি মাঠে আসার পর স্পেন আক্রমণের চাপ আরও বাড়ে। ৮৭ মিনিটে ওলমোর বাড়ানো মাইনাস বক্সের মাঠে সুবিধাজনক অবস্থায় পেয়েও ওয়ারজাবাল শটটা গোলে রাখতে ব্যর্থ হন।
২০০২ বিশ্বকাপে ফ্রান্সে ১–০ গোলে হারিয়ে অভিষেকেই চমক দিয়েছিল সেনেগাল। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইতালিকেও একই ব্যবধানে হারিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল সৌদি আরব। ম্যাচের শেষদিকে কেপ ভার্দের সামনেও সুযোগ এসেছিল অঘটন ঘটানোর।