বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিদায়ী ভাষণে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন।
আজ বাংলাদেশ জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (বিএনপি) সভাপতি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তাঁর শপথ গ্রহনের আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বিদায়ী ভাষণে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। ভারতের নাম উল্লেখ না করে তিনি তাঁর পুরনো বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। ইউনূস উত্তর–পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে ‘সেভেন সিস্টারস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বক্তব্য চীনের প্রতি তাঁর আনুগত্যও প্রকাশ পেয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সফরের সময় মুহাম্মদ ইউনূস বেজিংয়ে ‘সেভেন সিস্টারস’–এর কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি এটাকে সম্পূর্ণভাবে স্থলবেষ্টিত অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের জন্য ভারত মহাসাগরের একমাত্র রক্ষক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ভারত প্রতিবাদ করায় নীরব হয়ে গিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। তবে ভারতের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ তীব্র মাত্রায় ছিল। তাছাড়া, ইউনূস প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সরকারের আশ্রয় দেওয়াটাও ভালভাবে নেননি। পরবর্তীকালে ইউনূসকে বেশ কয়েকবার হাসিনা সম্পর্কে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তবে বিএনপি নেতা তারিক রহমান বাংলাদেশে ফিরে আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।
বিদায়ী ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস সরাসরি ভারতের কথা উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর ইঙ্গিত মূলত ভারতের দিকেই। নেপাল এবং ভুটানের কথাও উল্লেখ করেছিলেন ইউনূস, কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সুরে। তিনি বাংলাদেশকে যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউনূস বলেন, ‘আমার শাসনকালে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশ নয়, যেখানে পররাষ্ট্রনীতির আজ্ঞাবহতা বা অন্য দেশের নির্দেশ ও পরামর্শ অনুসরণ করে চলবে। দেশ এখন নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রস্তুত বাংলাদেশ।’ তিনি প্রতিবেশী দেশের নাম উল্লেখ না করে বারবার ভারতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন।
রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মুহূর্তে তাঁর ভাষণে ইউনূস জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘বাংলাদেশ পররাষ্ট্র নীতিতে সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা এবং স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছে। আর অন্যের নির্দেশ দ্বারা পরিচালিত হয় না।’ তিনি নেপাল, ভুটান এবং ‘সেভেন সিস্টার্স’–এর কথাও তুলে ধরেন। ইউনূস বলেন, ‘আমাদের উন্মুক্ত সমুদ্র কেবল সীমান্ত নয়, এটা বিশ্ব অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। নেপাল, ভুটান এবং সেভেন সিস্টার্সের সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রচুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্কমুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার আমাদের একটা বিশ্বব্যাপী উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।’
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিদায়ী নেতার সুর আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন তিনি কৌশলগত ভারসাম্যর ওপর জোর দেন। ইউনূস চীন, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি চীন সমর্থিত প্রকল্পগুলির অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী উদ্যোগ, যা ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। যে প্রকল্পগুলিকে ভারত ঐতিহাসিকভাবে সতর্কতার সাথে দেখে আসছে। ইউনূস বলেন, ‘আমরা চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করেছি। তিস্তা নদী প্রকল্প এবং নীলফামারীতে ১০০০ শয্যাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।’ আঞ্চলিক অংশীদারদের আশ্বস্ত করার পরিবর্তে তিনি ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ আর ভারতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদনশীলতাগুলিকে অগ্রাধিকার দেবে না।
বিদায়ী ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের প্রক্রিয়া আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এখন নতুন সরকারের দায়িত্ব হল এটাকে ধ্বংস করা নয়, এটা বজায় রাখা। শেখ হাসিনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা ছিল মুক্তির দিন। দেশের মানুষ শেখ হাসিনার ওপর অতিষ্ঠ ছিল। জনগণ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। সেদিন বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশিরা আনন্দে অশ্রু ঝরাচ্ছিল। তরুণরা আমাদের দেশকে এক দানবের কবল থেকে মুক্ত করেছে। এই নির্বাচন ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে।’
বিদায়ী ভাষণে বিএনপি সভাপতি তারিক রহমানকেও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। উন্মুক্ত সমুদ্র কেবল একটা ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার এই অঞ্চলের একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে উত্থানের ভিত্তি স্থাপন করছে।’ ইউনূস আরও বলেন, ‘আমাদের বন্দরের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলির সাথে চুক্তিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। যদি আমরা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা অর্থনৈতিক অর্জনে পিছিয়ে থাকব।’