ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত কেলেঙ্কারি গুলির মধ্যে শীর্ষে ছিল বোফর্স কেলেঙ্কারি। এটা শুধুমাত্র একটা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না, বরং এমন একটা বিতর্ক তৈরি করেছিল, যা দেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। বোফর্স কেলেঙ্কারির অভিযোগে সরকারের পতন ঘটেছিল। প্রায় চার দশক ধরে ধারাবাহিক তদন্ত, আদালত ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলতে থাকে। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বোফর্স মামলায় হিন্দুজা ভ্রাতৃদ্বয় এবং সুইডিশ অস্ত্র নির্মাতা এবি বোফর্সের বিরুদ্ধে সমস্ত ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করে দেওয়া ২০০৫ সালের দিল্লি হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটা আবেদন বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দিয়েছে । এই আদেশের ফলে হিন্দুজা ভ্রাতৃদ্বয় এবং এবি বোফর্সের বিরুদ্ধে মামলা পুনরায় শুরু করার আর কোনও সুযোগ রইল না। ৪০ বছর পর সমাপ্তি ঘটল বোফর্স মামলার অধ্যায়ের।
শুনানির সময় মামলা চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা জানতে চান, যখন দিল্লি হাইকোর্ট ২০০৫ সালেই মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে এবং সেই রায়ের বিরুদ্ধে সিবিআই–এর আপিলও ব্যর্থ হয়েছে, তখন আর কীসের বিচার বাকি আছে। ২০০৫ সালের ৩১ মে দিল্লি হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে শ্রীচন্দ, গোপীচন্দ ও প্রকাশ হিন্দুজাকে এবি বোফর্সের সঙ্গে সমস্ত ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যপ্রমাণে গুরুতর ঘাটতি খুঁজে পায় এবং জানায় যে, ১৯৮৬ সালের বন্দুক চুক্তিটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে হিন্দুজা ভাইদের কোনও প্রত্যক্ষ ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে কিংবা তাদের দ্বারা কথিতভাবে প্রাপ্ত অর্থ অবৈধ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা প্রমাণ করতে সিবিআই ব্যর্থ হয়েছে।
বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং কে বিনোদ চন্দ্রনের সমন্বয়ে গঠিত একটা বেঞ্চ হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জকারী আইনজীবী ও বিজেপি নেতা অজয় কে আগরওয়ালকে আর সময় দিতে অস্বীকার করেছে। বেঞ্চ জানিয়েছে যে, শুধুমাত্র এই একটি বিষয়ের জন্য ২০১৮ সাল থেকে বিচারাধীন মামলাটি বিলম্বিত করতে তারা আগ্রহী নয়। আদালত বলেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা যদি তাদের আপিল আবেদন খারিজ হওয়ার পরেও আপিল না করে, তাহলে অন্য কোনও ব্যক্তিগত আপিল কীভাবে থাকতে পারে। এটিও খারিজ করা হল এবং স্থগিত করার কোনও প্রয়োজন নেই।
১৯৯০ সালে সিবিআই একটা এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালে সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাঙ্ক রেকর্ড, নথি এবং আইনি সহায়তা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। বিদেশি আদালতে আইনি প্রক্রিয়া, নথিপত্রের অনুবাদ, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ এবং দীর্ঘ তদন্তের ফলে আনুমানিক প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। তা সত্ত্বেও, তদন্তকারী সংস্থা আদালতে সমস্ত অভিযোগ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।
সুপ্রিম কোর্টের এই আবেদন খারিজ করার মাধ্যমে হাইকোর্টের ২০০৫ সালের ৩১ মে-র সিদ্ধান্তকে ঘিরে আইনি বিবাদের অবসান ঘটল। সেই সিদ্ধান্তে বিচারপতি আরএস সোধি শ্রীচন্দ, গোপীচন্দ ও প্রকাশ হিন্দুজা এবং বোফর্স কোম্পানির বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছিলেন। তিনি মামলাটি পরিচালনার জন্য সিবিআই–এর তীব্র সমালোচনা করে উল্লেখ করেন যে, এই তদন্তে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে, মামলা দায়ের করতে ৪৫২২ দিন বিলম্বের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে সংস্থাটির ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট একই হাইকোর্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সিবিআই–এর আপিল শুনতে অস্বীকৃতি জানায়।
১৯৮৬ সালের ২৪ মার্চ ভারত সরকার সুইডিশ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোফর্স এবি–র কাছ থেকে ১৫৫ মিমি এফএইচ–৭৭বি হাউইটজার ক্রয় করে। এই চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ১৪৩৭ কোটি টাকা। এই চুক্তির অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪১০টি আধুনিক হাউইটজার পাওয়ার কথা ছিল। সেই সময়ে এটিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণের পথে একটা বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে, এক বছর পর এই চুক্তিটি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
১৯৮৭ সালের ১৬ এপ্রিল, সুইডিশ রেডিও দাবি করে যে, চুক্তিটি নিশ্চিত করার জন্য বোফর্স কোম্পানি ভারতীয় কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছিল। এই তথ্যটি ভারতে একটা রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি করে। বিরোধী দলগুলো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করে। তবে, রাজীব গান্ধী সংসদে এবং জনসমক্ষে ঘুষের এই অভিযোগ দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেন।
তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকারের ওপর বোফর্স কেলেঙ্কারির প্রভাব ছিল সর্বাধিক। ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী দলগুলি এটাকে এক প্রধান নির্বাচনী ইস্যু বানিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বোফর্স কেলেঙ্কারি ভারতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে একটা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। জনগণের মাঝে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছিল এবং কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।