বিপক্ষের চোখে চোখ রেখে ফুটবল। তাও আবার ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মতো দলের বিরুদ্ধে! দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতীয় দলের মানসিকতাই বদলে দিয়েছেন খালিদ জামিল। আর ব্রাজিল ম্যাচের জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে পানামা ম্যাচ। না হলে কি আর ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের বিরুদ্ধে এভাবে লড়াই করা যায়! ৪–০ গোলে হারলেও কুর্নিশ করতেই হবে ভারতীয় দলের। ব্রাজিলের কাছে এই পরাজয় খালিদ জামিলের দলের কাছে কিন্তু যথেষ্ট সম্মানের।
২৮ মিনিট পর্যন্ত সমানে সমানে টক্কর। বিশ্বের ৫ নম্বর দলকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৩৮ ম্বরে থাকা দলের এতক্ষণ আটকে রাখা মুখের কথা নয়। তবুও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন আনোয়ার আলি, অভিষেক সিং, আকাশ মিশ্র, আপুইয়ারা। শুরু লড়াই চালিয়ে যাওয়া নয়, চোখে চোখে রেখে ফুটবল খেলছিলেন রায়ান উইলিয়ামস, মনবীর সিংরা। ব্রাজিলের বাঁদিক থেকে ভিনিসিয়াস জুনিয়র যেমন আক্রমণ তুলে নিয়ে আসছিলেন, তেমনই বাঁদিক থেকে এস্তাভো। রিয়েল মাদ্রিদ ও চেলসির দুই উইঙ্গারকে যেভাবে আটকে রাখছিলেন আনোয়ার আলি, অভিষেক সিং, আকাশ মিশ্ররা, সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
পানামা ম্যাচে যে কৌশল নিয়েছিল ভারত, ব্রাজিলের বিরুদ্ধেও সেই একই কৌশল। রক্ষণ জমাট করে মাঝমাঠ থেকে দুই প্রান্তে লম্বা পাস বাড়ানো। আপুইয়া, আকাশ মিশ্র, অভিষেকদের পাসগুলো কিন্তু সঠিক হচ্ছিল না। ফলে মারকুইনোস, দানিলোদের খুব বেশি বিব্রত হতে হয়নি। তার মধ্যেই ৬ মিনিটেই দু’দুটি কর্নার আদায় করে নিয়েছিল ভারত। যদিও কাজে লাগাতে পারেনি। ৭ মিনিটে অবশ্য বক্সের মধ্যে সুবিধাজনক জায়গায় বল পেয়ে গিয়েছিলেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। অভিষেক সিং গায়ে লেগে থেকে বাইরে শট মারতে বাধ্য করেন। পরের মিনিটেই ভিনির শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ দক্ষতার সঙ্গে বাঁচান গুরপ্রীত।
ভারতও বিক্ষিপ্ত লগ্নে প্রতিআক্রমণে উঠে আসার চেষ্টা করছিল। ১৫ মিনিটে বিজয়ের পাস থেকে মনবীর সুবিধাজনক জায়গায় বল পেয়ে গিয়েছিলেন। সময়মতো বল বিপদমুক্ত করেন মারকুইনহোস। ২ মিনিট পর মনবীর গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছিলেন। বল বাইরে যায়। ভারতীয় ফুটবলারদের এই যে ব্রাজিলের বক্সে আক্রমণ তুলে নিয়ে আসা, এটাই সাহসিকতার পরিচয়। ২০ মিনিটে আরও একবার সুযোগ এসেছিল ভিনির সামনে। অভিষেককে টলিয়ে শট নিয়েছিলেন। দারুণ দক্ষতার সঙ্গে বাঁচান গুরপ্রীত।
অবশেষে ২৮ মিনিটে যাবতীয় প্রতিরোধ ভেঙে যায়। ডানদিক থেকে বল ধরে বিজয়কে টলিয়ে বাঁপায়ে শট নেন এস্তাভো। গুরপ্রীতের হাতে লেগে বল জালে জড়িয়ে যায়। ৩৬ মিনিটে ব্রাজিলের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পোস্ট। পেদ্রোর শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে ব্যবধান বাড়তে বেশি সময় লাগেনি। ৪২ মিনিটে বাঁদিক থেকে থ্রু বল বাড়িয়েছিলেন এস্তাভো। দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে সেই বল ধরে গোল লক্ষ্য করে শট নেন পেদ্রো। বেরিয়ে এসে গোলমুখ ছোট করেছিলেন গুরপ্রীত সিং। বল তাঁর হাতে গেলে জালে জড়িয়ে যায়। ২ মিনিট পর ভিনির একটা শট আরও একবার গুরপ্রীতের হাত থেকে বেরিয়ে যায়। এক্ষেত্রে কর্নারের বিনিময়ে বল বিপদমুক্ত করেন আপুইয়া। প্রথমার্ধে মাত্র ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল। ভারতের কাছে এই ফল কিন্তু একেবারেই লজ্জার নয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ৫টি পরিবর্তন করেন ব্রাজিল কোচ কার্লো আনসেলোত্তি। মারকুইনহোস, ডগলাস স্যান্টোস, ভিনিসিয়াস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল বি, মাথেউজিনহোর পরিবর্তে মাঠে নিয়ে আসেন ভ্যান্ডারসন, ব্রুনো গুইমারেস, স্যামুয়েল লিনো, ডগলাস লুইস এবং গ্যাব্রিয়েলকে। অন্যদিকে, খালিদ জামিল তিনটি পরিবর্তন করেন। গুরপ্রীত সিং, আকাশ মিশ্র, আশিক কুরুনিয়ানকে তুলে মাঠে নামান প্রভসুখন গিল, সানান ও জয় গুপ্তাকে। লাল–হলুদ গোলকিপার প্রভসুখনের ব্রাজিলের বিরুদ্ধেই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অভিষেক হল।
দ্বিতীয়ার্ধে অন্য চেহারায় ভারত। বিরতিতে খালিদ জামিলই হয়তো সাহসটা জুগিয়েছিলেন। না হলে বারবার এইরকম আক্রমণে উঠে আসবে কেন ভারত? ৫২ মিনিটে ডানদিক থেকে বল নিয়ে ঢুকে গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছিলেন রায়ান। বল সরাসরি ব্রাজিল গোলকিপারের হাতে চলে যায়। পরের মিনিটেই বাঁদিক থেকে আক্রমণ মনবীরের। মাঠমাঠ থেকে লম্বা পাস পেয়ে বক্সে ঢুকে বাঁপায়ে শট নিয়েছিলেন। বল গোলে ঢোকার মুখে কোনও রকমে ফিস্ট করে কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান ব্রাজিল গোলকিপার। ৫৮ মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় ব্রাজিল। বাঁদিক থেকে বক্সে ঢুকে বাঁপায়ের কোনাকুনি শটে ৩–০ করেন স্যামুয়েল লিনো।
৬০ মিনিটে আবার দুই দলে পরিবর্তন। আনসেলোত্তি যেমন পেদ্রো, দিয়াজ, আন্দ্রে স্যান্টোসকে তুলে মাঠে নামান এন্ড্রিক, মার্তিনেল্লি, মৌরো, জায়েরদের। তেমনই খালিদ সাহাল ও অভিষেককে তুলে মাঠে নিয়ে আসেন এডমুন্ড ও ভালপুইয়াকে। ৬৪ মিনিটে ব্যবধান কমানোর সুযোগ এসে গিয়েছিল ভারতের সামনে। রায়ানের শট গোল লাইন থেকে বাঁচান মৌরো। ৬৭ মিনিটে মনবীর একটা দুর্দান্ত বল বাড়িয়েছিলেন রায়ানের উদ্দেশ্যে। সামনে ব্রাজিল গোলকিপারকে একা পেয়েও বল বাইরে মারেন রায়ান। ৮০ মিনিটে আনোয়ার অনিরুদ্ধ থাপা, আপুইয়া, মনবীর, রায়ানকে তুলে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে মেহতাব সিং, ম্যাকার্টন, রহিম আলি বিক্রমপ্রতাপ সিং এবং ফারুখ চৌধুরিকেও খেলার সুযোগ করে দেন খালিদ। পরে বেশ কয়েকবার ভারতের গোল লক্ষ্য করে শট নিলেও ব্যবধান বাড়াতে পারছিল না। তবে একেবারে ম্যাচের অন্তিম বাঁশি বাজার আগে ৪–০ করে যান স্যামুয়েল লিনো।
এই পরাজয় কিন্তু ভারতের কাছে মোটেই লজ্জার নয়।