যা হবার নয়, তাই হতে গিয়ে ভারতীয় ফুটবল এখন গভীর গাড্ডায়। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি কল্যাণ চৌবে ভেবেছিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ টিমকে এনে একটা চমক দেবেন। সঙ্গে আর্থিক দিক থেকে ধুঁকতে থাকা ভারতীয় ফুটবলকে চাঙ্গা করবেন কিছুটা। আর এই তিনটি ফিফা ফ্রেন্ডলিতে ভারতীয় ফুটবল দল যদি ভালো কিছু করতে পারে, তাহলে ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে একটা ‘দাগ’ রেখে যাবেন।
এই ‘দাগ’ আসলে কল্যাণের আরও একবার সভাপতি পদের জন্য নিজের দাবি আর একটু শক্ত করবার অন্যতম পদ্ধতি মাত্র।
ফেডারেশন সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে কল্যাণ গত চার বছর অনেক বির্তকের সম্মুখীন হয়েছেন। ব্রাজিল টিমকে খেলিয়ে চেয়েছিলেন যাবতীয় বিতর্কের মুখ বন্ধ করতে। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। শনিবারের ম্যাচের ফল কী হবে, তা আগাম বলা সম্ভব নয়। কিন্তু ম্যাচের টিকিট বিক্রির হাল আপাতত অত্যন্ত খারাপ। এমনিতেই হাল–আমলে ফুটবলপ্রেমী বাঙালি খেলা দেখতে চায় যথাসম্ভব কম পয়সায়। ১০০ টাকার বেশি খরচ করতে রাজি নয় কেউ। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও বেশি ঘোরালো, কারণ ব্রাজিল ম্যাচের টিকিটের দাম একেবারে আকাশছোঁয়া। শারদোৎসবের প্রাক্কালে এই চড়া দামের টিকিট কিনতে চাইবেন না অনেকেই। কারণ এই সময় বাঙালি ব্যস্ত থাকে পুজোর কেনাকাটায়। থাকে অন্যান্য নানা পারিবারিক খরচ, যা বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত ঊর্ধ্বগামী। ফলত, টিকিটের দাম শুনে অধিকাংশ বঙ্গবাসীর কলকাতায় ভারত বনাম ব্রাজিল ম্যাচ মাঠে বসে দেখার ইচ্ছে স্রেফ উড়ে গেছে।
তাহলে কি যুবভারতীর গ্যালারি ফাঁকা থাকবে? এই প্রশ্নটাই ঘুরছে চারদিকে। ম্যাচটিকে স্পনসর করছে এমন একটি কোম্পানি যা দিয়ে উঠবে না খরচের টাকা। ব্রাজিল ম্যাচের একটা টিকিট কাটলে আরও একটা ফ্রি। তাতেও বিশেষ চিঁড়ে ভেজেনি। প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, কোনও কমপ্লিমেন্টারি টিকিট নাকি থাকবে না। কিন্তু ম্যাচের সময় যত এগিয়ে আসছে, তত শোনা যাচ্ছে অকাতরে কমপ্লিমেন্টারি টিকিট বিলোচ্ছেন কল্যাণ নিজেই। দিন কয়েক আগে বেঙ্গালুরুতে বিশ্বকাপ খেলা দল পানামার বিরুদ্ধে খেলেছে ভারত। দুরন্ত ফুটবল উপহার দিয়ে ম্যাচ শেষ করেছে ১–১ গোলে। কিন্তু বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছিল মাত্র ৯ হাজার দর্শক।
এখন অবস্থা এমন, কত কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়বে ফেডারেশন, তা বলা মুশকিল। পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে তিনটি ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ আয়োজন করছে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন। বাজেট ধরা হয়েছিল সত্তর কোটি টাকা। তারমধ্যে আবার ফেডারেশনের বছরের ঘাটতি ১৪ কোটি টাকা। তিনটি ফিফা ফ্রেন্ডলি আয়োজন করে কল্যাণ হয়তো চেয়েছিলেন কিছুটা ঘাটতি মেটাতে। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। স্পনসর দিয়ে ঘাটতি মিটবে, সে রকম অবস্থাও নেই।
আরও পড়ুনঃ স্বামী থাকবেন মহাকাশে, স্ত্রী জন্ম দেবেন সন্তানের, ৪ নভোচারীকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠাল স্পেসএক্স
আরও পড়ুনঃ ২০২৭ একদিনের বিশ্বকাপের সূচি ঘোষণা, একই গ্রুপে ভারত–পাকিস্তান, মুখোমুখি ১০ অক্টোবর
আসলে কল্যাণ চৌবের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কম। ২০১১ সালে মেসিসহ আর্জেন্তিনা টিম ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছিল যুবভারতীতে। সেই ম্যাচের আয়োজক ছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। সে বছর শারদোৎসবের ঠিক এক মাস আগে ছিল মেসি ম্যাচ। ৩ সেপ্টেম্বর সে দিনের ম্যাচের আয়োজকরা টিকিটের নয় রকমের দাম রেখেছিলেন। সর্বনিম্ন ৭০০ টাকা। তারপরে ১০০০, ১৫৫০, ১৮৬০, ২০৬০, ২৪৭০, ২৫৭০, ৩৫৯০ ও ৫১২০। শেষ দুই বিভাগের টিকিট ছিল ভিআইপি গ্যালারিতে। সেই ম্যাচে আয়োজকরা প্রায় ৫৫ হাজার টিকিট বিক্রি করেছিলেন। কানায় কানায় পূর্ণ না হলেও যুবভারতীর গ্যালারি ছিল প্রায় ভর্তি।
ব্রাজিল ম্যাচে টিকিটের সাত রকম দাম। ৯৯৯ থেকে শুরু। তারপরে ৩৫০০, ৫০০০, ৬০০০, ৭০০০, ৯০০০ ও ১৫০০০। টিকিটের নির্ধারিত অ্যাপ খুললে বিস্ময় জাগে। পুরো স্টেডিয়াম কার্যত ফাঁকা। বিশ্বকাপের ব্রাজিল টিমের খেলা দেখার জন্য টিকিটের এই দাম হয়তো সঠিক। কিন্তু মাথায় রাখা দরকার ছিল, বাঙালির আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি। যুবভারতীতে সর্বোচ্চ টিকিটের দাম ১৫ হাজার টাকা। ভেবে দেখবেন একবার, অনেক বাঙালি ঘরে মাসে আয় এই ১৫ হাজার টাকাই। এবং এই অল্প আয়ের ফুটবল ভক্তরাই যুবভারতীতে ভিড় করে থাকেন বিভিন্ন ক্লাবের সমর্থক হয়ে।
দু’বছর আগে আইএফএ সচিব অনিবার্ণ দত্ত কলকাতা লিগের বিভিন্ন ম্যাচ সরাসরি দেখার জন্য বিদেশি একটি সংস্থাকে নিয়ে এসেছিলেন। শর্ত ছিল সেই অ্যাপের সদস্যপদ পেতে হলে দিতে হবে এক টাকা। আর কোনও চাহিদা ছিল না। সেই সদস্যপদের সংখ্যাটা এত কম ছিল, যে পরের বছর আইএফএ–র সঙ্গে আর চুক্তি দীর্ঘায়িত করেনি সেই বিদেশি সংস্থা।
বলতে দ্বিধা নেই, ঝুঁকিটা খুবই মারাত্মক হয়েছে ফেডারেশনের পক্ষে। আগামী ২৪ ঘন্টায় মিরাকল না ঘটলে বিশাল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন।