বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ইউরোপ। ইউরোপ জুড়ে মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ ভাড়া এবং সরকারি পরিষেবা হ্রাসের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে তরুণরা। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, গ্রিস, সার্বিয়া এবং আলবেনিয়াসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে তরুণরা আগেই রাস্তায় নেমেছে। এবার জার্মানিতে। জার্মানিতে বিক্ষোভ হিংসাত্মক আকার ধারণ করেছে। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্টসহ বেশ কয়েকটা শহরে ব্যাপক লুটপাট এবং পুলিশের ওপর হামলা হয়েছে। ২৭ জন পুলিশ আহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন আটক হয়েছেন।
মুদ্রাস্ফীতি, শিক্ষা এবং সামরিক পরিষেবার বিরুদ্ধে ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদ চলছে। তরুণদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় হিংসার ঘটনা ঘটলেও, বিক্ষোভগুলি মূলত শান্তিপূর্ণই ছিল। তবে জার্মানির বেশ কয়েকটা শহরের পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টে দাঙ্গাকারীরা দোকানপাট লুটপাট ও ভাঙচুর করে। ফ্রাঙ্কফুর্টে পুলিশ সারারাত শহরের প্রধান কেনাকাটার রাস্তার একটি বড় অংশ বন্ধ করে দিয়েছে। পুলিশের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, শহরটিতে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ এবং বার্লিনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ১৮০০০-এরও বেশি বিক্ষোভকারী উপস্থিত ছিলেন।
বার্লিন, কোলন এবং হামবুর্গসহ বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জরুরি পরিষেবা কর্মীদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা বাজি, পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এই হিংসার ঘটনায় ২৭ জন পুলিশ কর্তা আহত হয়েছেন এবং শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
‘জেন জি রেগেল্ট’ (যার অর্থ ‘জেন জি দায়িত্ব নিচ্ছে’) নামক প্রচার গোষ্ঠীর আয়োজনে মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। স্কুলের জন্য তহবিলের অভাব, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর জার্মানির অন্যান্য শহরেও হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। কোলোনে পুলিশ জানিয়েছে, প্রধান রেলস্টেশনের কাছে কর্তাদের ওপর হামলা করা হয় এবং তাদের লক্ষ্য করে বোতল ছোড়া হয়।
বার্লিন পুলিশের জানিয়েছে, দিনের বেলায় বড় ধরনের বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় একটা ছোট বিক্ষোভ চলাকালে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। ৫৬ জনকে কিছু সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। এদিকে, হামবুর্গে কালো পোশাক পরা লোকজন আতশবাজি জ্বালিয়ে এবং ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ ১২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ইউরোপের অন্যান্য কয়েকটি দেশে চলমান বড় বিক্ষোভের মধ্যেই জার্মানিতে শনিবারের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়।
ফ্রান্সে তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভের পর জার্মানিতে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারি পরিষেবা, বিশেষ করে শিক্ষা খাতের শোচনীয় অবস্থার প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সে ৩ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। বিক্ষোভের জন্য ফ্রান্সজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। কিছু শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, শনিবারের বিক্ষোভে ৭৭০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি গত সপ্তাহের বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া সংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
ইতালিতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রোম ও তুরিনে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এদিকে, পর্তুগালে পুলিশ একটি নতুন তাঁবু শিবির সরিয়ে দিতে ব্যবস্থা নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ তাদের ভাড়ার বিলের প্রতিবাদে মিছিল করার পর এই শিবিরটি স্থাপন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এটি দেশের আবাসন সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। গত দশ বছরে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, গ্রিস, সার্বিয়া এবং আলবেনিয়াসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমেছে। যদিও দেশভেদে তাদের দাবি ভিন্ন, তবে বেশিরভাগ বিক্ষোভই জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের অভাব, শিক্ষার মান এবং সরকারি পরিষেবা হ্রাসের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে হয়েছে।