আজ এক বড় পরীক্ষার সম্মুখীন আমেরিকার গণতন্ত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমেরিকার জনগণ নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে কারা আধিপত্য বিস্তার করবে। ট্রাম্পের নীতিগুলো কি জনসমর্থন পাবে, নাকি বিরোধীরা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করবে? সিনেট থেকে শুরু করে প্রতিনিধি পরিষদ পর্যন্ত প্রতিটি আসনের ফলাফল আগামী ২ বছরের জন্য আমেরিকার রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের নীতি ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা।
আমেরিকার আজকের ভোট শুধু বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং তাঁর নীতিকেই পরীক্ষা করছে না। এটা শুধু আমেরিকা ও রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎই নয়, বিশ্ব ভূ–রাজনীতিও নির্ধারণ করবে। কিন্তু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হল মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সবার দৃষ্টি এখন হোয়াইট হাউসের দিকে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে একদিকে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি, এবং অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য আগাম ভোটগ্রহণ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। জনগণ ১০০টি সেনেট আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই ভোটপ্রয়োগ করছেন। এছাড়াও, ৩৬টি রাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণেই এই নির্বাচনকে ট্রাম্পের জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করা এক জিনিস, কিন্তু দুই বছর পরেও জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিষয়।
মার্কিন পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫টি আসন রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ২১৮টি আসন প্রয়োজন। বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির দখলে ২১৮টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের দখলে ২১৪টি আসন রয়েছে। সেনেটে মোট ১০০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৫১টি আসন প্রয়োজন। রিপাবলিকান পার্টির দখলে ৫৩টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের দখলে ৪৫টি আসন রয়েছে। দুটি আসন শূন্য রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত জরুরি। ট্রাম্প যদি চারটি আসনও হারান, তাহলে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবেন। তিনি মার্কিন পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণও হারাবেন।
ট্রাম্প নিজে এই নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও, তিনি নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। নির্বাচনের আগের দিন তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, আজ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের শেষ দিন। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবদ্দশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন এটা। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এমন একদল প্রার্থী দিয়েছে, যাদেরকে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্রপন্থী ও বিপজ্জনক বলা যেতে পারে। এই প্রার্থীদের এযাবৎকালের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রার্থী হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। তাদের চিন্তাভাবনা মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো। ওর সীমান্ত খুলে দেবে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের কর আরোপ করবে, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ওর সারা বিশ্বের শরণার্থীদের জন্য আমেরিকার দরজাও খুলে দেবে।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালে জনমত বোঝার জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনকে একটা প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৫ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন। যদি রিপাবলিকান পার্টি উভয় কক্ষেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে, তবে ট্রাম্প তার কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক সমর্থন লাভ করবেন। তবে, যদি ডেমোক্র্যাটিক পার্টি যে কোনও একটা কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষে আইন পাস করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর অর্থ হল, এই নির্বাচন শুধু আসন সংখ্যা নিয়েই নয়, বরং রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের তদারকির ভূমিকা নিয়েও বটে।
জনমত সমীক্ষায় অবশ্য ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে আছে। জাতীয় সাধারণ ব্যালটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ৮ থেকে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে আছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ৫১-৫৪% এবং রিপাবলিকানরা ৪২-৪৫% সমর্থন পাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনসমর্থন ৩২-৩৮ শতাংশ, যার অর্থ তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমাগত কমছে। ধারণা করা হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ২৩০-২৪৩টি আসন জিতবে। ডেমোক্র্যাটরা সেনেটেও তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। আজ আমেরিকায় সিদ্ধান্তটি শুধু ৪৩৫ জন এমপি ও ৩৫ জন সেনেটরের আসন নিয়ে নয়, বরং সেই রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও, যার মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাঁর মেয়াদের পরবর্তী দুই বছর কাটাতে হবে।
আমেরিকান ভোটারদের সামনে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, বিশ্বে আমেরিকার ক্ষমতা কতটা। বরং প্রশ্নটা হল, একজন সাধারণ আমেরিকান পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কতটা। একদিকে রয়েছে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা, অন্যদিকে জনগণের অর্থনৈতিক উদ্বেগ। অপরদিকে রয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রিপাবলিকানদের সংগ্রাম এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য ডেমোক্র্যাটদের প্রচেষ্টা।
প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘এই যুদ্ধ কী রকম চলছে? আমাদের মিত্র ও সামরিক ঘাঁটিগুলিতে হামলা হয়েছে। বহু আমেরিকান নিহত এবং শত শত আহত হয়েছেন। আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও কমে গেছে, যা হামলার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল চলাচলের ওপর ইরানের এখন এমন নিয়ন্ত্রণ যে, তারা তা বন্ধও করে দিতে পারে। এই পথেই বিশ্বের বহু দেশে তেল পৌঁছায়।’ এখন দেখার বিষয়, মার্কিন জনগণ হোয়াইট হাউসের পাশে দাঁড়াবে, নাকি কংগ্রেসের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করবে।