জাপানে এশিয়ান গেমসে অ্যাথলিটদের জন্য অপেক্ষা করে আছে এক অভিনব জীবনযাপন। আর তার জন্যই কন্টেনারে রাত কাটাচ্ছেন ভারতীয় অ্যাথলিটরা। এশিয়ান গেমসের জন্য জাপানে কোনও প্রচলিত অ্যাথলেটিক্স গেমস ভিলেজ তৈরি করা হয়নি। কন্টেনার, ক্রুজের মতো এক অনন্য শৈলীতে তৈরি ঘরে অ্যাথলিটদের রাখা হবে। তাই পাতিয়ালা ও বেঙ্গালুরুর কন্টেনার রুম তৈরি করেছে সাই। যাতে ভারতীয় অ্যাথলিটরা জাপান রওনা হওয়ার আগেই তাদের এই ব্যতিক্রমী এশিয়ান গেমসের আবাসন ব্যবস্থা পরখ করে নিতে পারেন।
কন্টেনারে যে বিছানাগুলি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি ৬ ফুটের সামান্য বেশি লম্বা, দেওয়ালগুলি কাছাকাছি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া অন্য কিছু রাখার তেমন জায়গা নেই। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আইচি–নাগোয়া এশিয়ান গেমস শুরু হচ্ছে। এবারের এশিয়ান গেমসে কোনও প্রচলিত অ্যাথলিটস ভিলেজ না থাকায়, অভিনব জীবনযাপনের প্রস্তুতির জন্য স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া ক্রীড়াবিদের জন্য এখানকার নেতাজি সুভাষ জাতীয় ক্রীড়া ইনস্টিটিউটে শিপিং কন্টেনারের ভেতরে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করেছে।
কন্টেনারগুলি প্রায় ১৩ মিটার লম্বা এবং ৩ মিটার চওড়া। দুই প্রান্তে দুটি করে শোবার ঘর রয়েছে, যা একটা সরু কেন্দ্রীয় পথ দিয়ে সংযুক্ত। ভেতরে দুটি স্প্লিট এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিনসহ একটা কাপড় ধোয়ার ছোট জায়গা ও ফ্রিজ এবং সিঙ্কসহ একটা ছোট রান্নাঘর রয়েছে। বাথরুমটি ওয়াশ বেসিন, টয়লেট এবং শাওয়ারের জন্য আলাদা আলাদা অংশে বিভক্ত। জিনিসপত্র রাখার জন্য ৪টি ক্যাবিনেট রয়েছে এবং বিছানাগুলি নিচে ভারী কিট ব্যাগ রাখা যায়, যা বড় আকারের সরঞ্জাম নিয়ে ভ্রমণকারী অ্যাথলিটদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অ্যাথলিটরা পালা করে কন্টেনারের ভেতরে রাত কাটাচ্ছেন এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগে তাদের স্বাভাবিক রুটিন অনুসরণ করছেন। আশা করা যায়, জাপানে পৌঁছানোর আগেই তাদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনও বিঘ্ন ঘটাবে না। ২বছর আগে যখন ঠিক হয়েছিল যে, জাপানে এশিয়ান গেমসে অ্যাথলিটদের থাকার ব্যবস্থা কোনও ভিলেজে না হয়ে কন্টেনার, ক্রুজ ইত্যাদির মতো অনন্য শৈলীতে তৈরি জায়গায় হবে, তখন ক্রীড়ামন্ত্রী ঠিক করেছিলেন অ্যাথলিটদের এই ধরণের পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত করানো উচিত। তাই এইরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যেসব ক্রীড়াবিদ বিশাল ঘর এবং সরঞ্জামের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য এই ছোট পরিসরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কিন্তু এশিয়ান গেমসে ২ বারের সোনাজয়ী শটপুটার তাজিন্দরপাল সিং তুর মনে করেন, এই আগাম প্রস্তুতি পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তিনি এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তুর বলেছেন, ‘বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ভেতরটা বেশ সুন্দর। এখানে সব ধরনের সুযোগসুবিধা আছে। এত ঘিঞ্জি পরিবেশে এই প্রথম আমরা থাকব, কিন্তু এখানে থেকে ভালো লাগছে যে, আমরা এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি সরাসরি জাপানে যেতাম, তাহলে ব্যাপারটা আমাদের মনে এক–দুদিনের জন্য থাকত।’ সাই এবং মন্ত্রণালয় ঠিক এটাই এড়াতে চেয়েছিল।
সাইয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল বিনীত কুমার বলেন, ‘অ্যাথলিটদের মনস্তত্ত্ব এমন যে, এই ধরনের কোনও লজিস্টিক সমস্যা থাকলে তা তাকে প্রভাবিত করে। তাই মন্ত্রীর লক্ষ্য ছিল যাতে এমনটা না ঘটে এবং অ্যাথলিটরা তাদের খেলায় মনোযোগ দিতে পারে।’ ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের কী ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, তার ওপর ভিত্তি করে পাতিয়ালায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য দুটি সিমুলেশন রুম প্রস্তুত করার আগে, মন্ত্রণালয় ও সাই–এর একটা দল সরেজমিনে পরিদর্শন করতে জাপান সফর করেছিল। বিনীত কুমার আরো জানান, ‘আমরা একটা তালিকা তৈরি করেছি এবং অ্যাথলিটরা এখানে পালাক্রমে থাকে। তাদের রাতটা এখানেই কাটাতে হয়, যাতে সকালে তারা জানতে পারে কীভাবে কাজগুলো করতে হবে।’
২৮ আগস্ট থেকে অ্যাথলিটরা কন্টেনারের ভেতর থাকতে শুরু করেছেন। তাজিন্দারপাল সিং তুর দ্রুত মানিয়ে নিলেও কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ পদকজয়ী ডিসকাস থ্রোয়ার সীমা কালিরমনার মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল। তিনি বলেন, ‘আমি এখানে ২ রাত ছিলাম। মানিয়ে নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ থ্রোয়ারদের একটু বেশি জায়গা লাগে। আর এই জায়গাটা বেশ ছোট। দ্বিতীয় দিনটা ভালো ছিল, আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পেরেছিলাম। একজন ক্রীড়াবিদের জীবনে অনেক মানিয়ে নিতে হয়, তারপরেই তারা কিছু জেতে।’
সীমার মতে, সিমুলেশনটি অনিশ্চয়তার একটা উপাদান দূর করেছে। তিনি বলেন, ‘এখানে থাকলে সুবিধা হবে, কারণ আমাদের বদ্ধস্থানের ভয়টা থাকবে না। এই ব্যবস্থা করার জন্য আমি সাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। জাপানে থাকার ব্যবস্থা কেমন হবে, সেই অভিজ্ঞতা পেয়ে গেলাম। এখন আর ভয়টা নেই। আমি এখন স্বস্তি বোধ করছি, কারণ সেখানকার ব্যবস্থা কেমন হবে বা আমাদের কেমন লাগবে, তা নিয়ে আমাদের আর ভাবতে হবে না।’
কন্টেনার দুটি এনএসএনআইএস–এ আগে থেকেই ছিল এবং কোভিড ১৯ মহামারীর সময় ভারোত্তোলন ও অ্যাথলেটিক্সের সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এশিয়ান গেমস সিমুলেশনের পর এর উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু কন্টেনারগুলি ব্যবহার করা হবে। এগুলি গেস্ট হাউসে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে দুটি বিছানা সরিয়ে দুজন করে থাকার উপযোগী কক্ষ তৈরি করা হবে।