ঘরোয়া ক্রিকেট কিংবা দেশের হয়ে খেলা টেস্টে সাফল্য। কিন্তু বারবার জাতীয় দলে উপেক্ষিত। কেন তাঁকে বারবার উপেক্ষা করা হয়েছিল, সদুত্তর পাওয়া যেত না নির্বাচকদের কাছে। সরফরাজকে বাদ দেওয়া নিয়ে চারিদিকে সমালোচনার ঝড় বইত। শেষ পর্যন্ত আর তাঁকে উপেক্ষা করতে পারলেন না জাতীয় নির্বাচকরা। অবশেষে ১৮ মাস পর আবার টিম ইন্ডিয়ার দরজা খুলে গেল সরফরাজ খানের সামনে। চোটের কবলে থাকা সাই সুদর্শনের জায়গায় শ্রীলঙ্কা সফরে ডাক পেলেন মুম্বইয়ের এই ডাকাবুকো ব্যাটার।
২০২৪ সালের নভেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ টেস্ট খেলেছিলেন সরফরাজ খান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া সফরেও দলে ছিলেন। কিন্তু একটা টেস্টেও খেলার সুযোগ পাননি। অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে ফেরার পর থেকেই তিনি টিম ইন্ডিয়ার বাইরে ছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে দুরন্ত পারফরমেন্স করা সত্ত্বেও তাঁকে দলে দলে সুযোগ দেননি নির্বাচকরা। জাতীয় দলে তাঁর সুযোগ না পাওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। সরফরাজকে ক্রমাগত উপেক্ষা করার জন্য নির্বাচক কমিটি এবং টিম ম্যানেজমেন্টও সমালোচিত হয়েছে। নির্বাচকরা একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাঁকে দলে ফেরালেন।
সরফরাজকে দলে ফেরার প্রধান কারণ হল স্পিনের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার দক্ষতা এবং চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে রান করার ক্ষমতা। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুটি টেস্ট খেলবে ভারত। গল ও কলম্বোর বাইশ গজ স্পিন সহায়ক। বর্তমান ভারতীয় দলের ব্যাটাররা স্পিনের বিরুদ্ধে ততটা সাবলীল নন। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে। স্পিনের বিরুদ্ধে সরফরাজের হাত যথেষ্ট ভাল। সেকথা মাথায় রেখেই তাঁকে দলে ফেরানো হয়েছে।
যদিও সরফরাজকে বাধ্য হয়েই ফেরাতে হয়েছে নির্বাচকদের। সফরের আগে দল ঘোষণার সময় চোট পাওয়া সাই সুদর্শনকে দলে রেখেছিলেন নির্বাচকরা। চোট পুরোপুরি সারলেই তিনি শ্রীলঙ্কায় যেতেন। টিম ম্যানেজমেন্ট শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাই সুদর্শনের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সিলেন্সের মেডিকেল টিমের ফিট সার্টিফিকেট পাননি। সাই সুদর্শন সিরিজ থেকে ছিটকে যাওয়ায় সরফরাজ খানকে দলে নেওয়া হয়েছে। তিনি আজই কলম্বোতে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন।
একটু ফিরে তাকানো যাক, ২০২৪ সালের শেষের দিকে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে বিপর্যয়ে পড়েছিল ভারত। সিরিজটি ঐতিহাসিক ০–৩ হোয়াইটওয়াশে শেষ হয়। ঘরের মাঠে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে এই প্রথমবার ভারত হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে সরফরাজ উজ্জ্বল মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন। বেঙ্গালুরুতে সিরিজের প্রথম টেস্টে লড়াকু ১৫০ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। এই ইনিংস সরফরাজের কেরিয়ারকে কেবল পূর্ণতা দেয়নি, বরং তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাকি সিরিজে অবশ্য রান পাননি।
অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত বর্ডার–গাভাসকার ট্রফিতে একটা টেস্টেও খেলার সুযোগ পাননি। এর পরপরই তাঁর টেস্ট ক্রিকেট থেকে নির্বাসন শুরু হয়। গত বছর ইংল্যান্ড সফরের জন্য ঘোষিত ভারতীয় দল থেকে তিনি বাদ পড়লেও ভারত ‘এ’ দলে সুযোগ পান এবং ঘরোয়া ও ‘এ’ দলের হয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেন। ৬ টেস্টে ৩৭১ রান, ১টা সেঞ্চুরি ও ১টা হাফ সেঞ্চুরি করা, দেশের অন্যতম সেরা ৬৪.৭৩ প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে গড় থাকা একজন ব্যাটারের জন্য এটা ছিল এক অদ্ভুত নির্বাসন। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে গেলেন সরফরাজ। ২০২৫–২৬ রনজি মরশুমে ৭ ম্যাচে ৫৩.৬২ গড়ে ৪২৯ রান করে মুম্বইয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। পরিসংখ্যান তাঁকে আলোচনায় রেখেছিল, কিন্তু সুযোগ দেয়নি।
কিন্তু আরেকটা বিষয় তাঁকে ব্যকফুটে ঠেলে দিয়েছিল, সেটা হল ফিটনেস। ফিটনেস নিয়ে সমালোচনা তাঁকে বছরের পর বছর ধরে তাড়া করে এসেছে। সরফরাজ এই বিতর্ককে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রায় ৬ সপ্তাহ ধরে কঠোর খাদ্যতালিকা ও শরীরচর্চার মাধ্যমে প্রায় ১৭ কিলোগ্রাম ওজন কমান। রুটি, ভাত, চিনি, ময়দা এবং বেক করা খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেন এবং খাদ্যতালিকায় আরও বেশি ফল ও শাকসবজি, গ্রিল করা মাছ ও মুরগি, সেদ্ধ ডিম, অ্যাভোকাডো এবং গ্রিন টি অন্তর্ভুক্ত করেন। এটা ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, ভারতের পরিকল্পনায় পুনরায় জায়গা করে নেওয়ার তাঁর প্রচেষ্টারই আরেকটা অংশ।
প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হওয়ার কয়েকদিন আগে, সরফরাজ ইনস্টাগ্রামে তেলেগু ছবি ‘জার্সি’–র একটা লাইন শেয়ার করে একটা বার্তা পোস্ট করেন, ‘আমি হয়তো মানিয়ে নিতে পারব না, কিন্তু আমি লড়াই করব।’ তাঁর দলে ফেরা নিয়ে জল্পনা–কল্পনার মধ্যেই পোস্টটি দ্রুত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটা গত দুই বছরে তাঁর কেরিয়ারের গল্পের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে গিয়েছিল, একজন ব্যাটার যিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরেকটা সুযোগের অপেক্ষায় থেকেও বোর্ডে রান করে গেছেন।
শ্রীলঙ্কায় উড়ে গেলেও ১৫ আগস্ট থেকে গলে শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্ট ম্যাচে সরফরাজের প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। জাতীয় দলের হয়ে সাই সুদর্শন তিন নম্বরে ব্যাট করেন। সরফরাজ আগে কখনও এই পজিশনে ব্যাটিং করেননি। শ্রীলঙ্কা একাদশের বিরুদ্ধে টিম ম্যানেজমেন্ট তিন নম্বরে দেবদত্ত পাড়িক্কলকে নামিয়েছিল। দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে তিন নম্বরে নিজের দাবি জোরালো করেছেন পানিক্কল। মিডল অর্ডারে সরফরাজের লড়াই ধ্রুব জুরেলের সঙ্গে। আপাতত জুরলেই অগ্রাধিকার পাবেন। ১৮ মাস পর দলে ফিরলেও সরফরাজকে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।