উত্তরের পর্বতমালা থেকে দক্ষিণের উপকূল, প্রাণবন্ত পূর্ব থেকে বিশালায়ন পশ্চিম, অসাধারণ বৈচিত্র্য সত্ত্বেও দেশকে এক সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা, শান্তির পথে এগিয়ে চলার জন্য ঐক্যবদ্ধ। ১২টি রাজ্য ও ৩০টিরও বেশি শহর জুড়ে ৭০০০–এরও বেশি মানুষকে নিয়ে ‘বিশ্ব শান্তি যাত্রা ২০২৬’ আয়োজন করল অখিল ভারতীয় আধ্যাত্মিক সমিতি। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত চেতনার এক জাতীয় প্রকাশে একত্রিত করা হয়েছিল।
এই ‘বিশ্ব শান্তি যাত্রা ২০২৬’ কেবল ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রমের কোনও যাত্রা নয়, এটা ছিল ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে এক যাত্রা। এই যাত্রায় বিভিন্ন ঐতিহ্য, প্রজন্ম, সম্প্রদায় ও জীবনধারা একটা অভিন্ন বার্তার অধীনে একত্রিত হয়েছিল, ‘আমিই শান্তি’। এই যাত্রা ভারতের সেই চিরন্তন চেতনাকে প্রতিফলিত করেছিল, যেখানে বৃহত্তর ঐক্যের ধারণার মধ্যেই সর্বদা বৈচিত্র্য নিজের স্থান করে নিয়েছে। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভাষা, রীতিনীতি, পোশাক–পরিচ্ছদ, সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ভিন্নতা দেখা গেলেও মূল বার্তাটি ছিল অভিন্ন, ‘শান্তি ব্যক্তির অন্তরেই শুরু হয় এবং তাতেই বিশ্বের বুকে তার প্রকাশ ঘটে।’
এই যাত্রার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক শক্তিশালী ভাবনা, ‘আন্তরিক শান্তি সে বিশ্ব শান্তি’, অর্থাৎ অন্তরের শান্তি থেকে বিশ্বশান্তি। ‘বিশ্ব শান্তি যাত্রা’ প্রতিটি মানুষকে শান্তির ধারণাকে কেবল জাতি বা সমাজের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। এটা মানুষকে একটা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা অনুধাবন করতে এবং শান্তিকে বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। আর যখনই মানুষ শান্তিকে বেছে নেয়, তখন তা তাদের পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে শুরু করে সমগ্র জাতি ও বিশ্বের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
প্রেম অবতার মৈত্রেয় দাদাশ্রীজীর দ্বারা অনুপ্রাণিত ‘আমিই শান্তি’ বার্তাটি সমগ্র ভারতজুড়ে মানুষের মধ্যে এক সহজ অথচ গভীর প্রত্যয় হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তি পদযাত্রা, মানব–শৃঙ্খল, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন, আলোচনা এবং সম্মিলিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে এই যাত্রাটি একটা অভ্যন্তরীণ বার্তাকে দৃশ্যমান গণআন্দোলনে রূপান্তরিত করেছে। এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মৈত্রেয় দাদাশ্রীজীর কৃপা ও আশীর্বাদে ‘বিশ্ব শান্তি প্রার্থনা’র সূচনা। এই প্রার্থনার উদ্দেশ্য ছিল শান্তি, সহানুভূতি ও সংহতির সম্মিলিত প্রকাশে মানবতাকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার যৌথ দায়িত্বকে স্বীকার করে নেওয়া।
এই যাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি। শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠ, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী, পরিবার ও তরুণ প্রজন্ম, সবস্তরের মানুষ এতে শামিল হয়েছিলেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়, পেশা, সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষ, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সুস্থতা–কেন্দ্রিক গোষ্ঠী এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রের মানুষ একত্রে এগিয়ে এসেছিলেন। প্রতিটি শহর তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও অভিব্যক্তি নিয়ে এসেছিল, আর সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল শান্তির এক শক্তিশালী ও বর্ণিল মেলবন্ধন। এই যাত্রাটি ভারতের প্রকৃত সত্তারই এক উদযাপন হয়ে উঠেছিল, যেখানে রয়েছে অভিন্নতার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ঐক্য, বিভাজন ছাড়াই বৈচিত্র্য এবং এমন এক মানবিক আকাঙ্ক্ষা যা সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
যদিও এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভারত, তবুও ‘আমিই শান্তি’–র বার্তা আন্তর্জাতিক স্তরেও সাড়া ফেলেছিল। বিশ্বের ২৩টিরও বেশি দেশ ও ১০০টি শহরের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে এই আন্দোলন মানুষকে সংযুক্ত করেছে এবং বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে শান্তি হল এক সর্বজনীন ভাষা।
এই শান্তি যাত্রা উপলক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অখিল ভারতীয় আধ্যাত্মিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিত্র প্রবেশ বলেন, ‘‘ভারত সর্বদা ‘বহুর মাঝে এক’–এর চেতনাকে উদযাপন করে এসেছে। ‘বিশ্ব শান্তি যাত্রা’ হল সেই চিরন্তন চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ একত্রিত হয়েছেন এবং শান্তির অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে একসাথে পথ চলেছেন। যখন আমাদের চিন্তা, কথা ও কাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে অভ্যন্তরীণ শান্তি, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র বিশ্বকে স্পর্শ করতে শুরু করে। আর এটাই হল ‘আন্তরিক শান্তি সে বিশ্ব শান্তি’–র মূল চেতনা।’
এই যাত্রাটি ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্ম–নিরপেক্ষ, এতে জাতি–ধর্ম–বর্ণ, বিশ্বাস, পেশা, বয়স বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল মানুষকে স্বাগত জানানো হয়েছে। ‘বিশ্ব শান্তি যাত্রা ২০২৬’ আমাদের সম্মিলিতভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, বিশ্ব শান্তির পথে যাত্রা শুরু হতে পারে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর এক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে, আমি শান্তিকেই বেছে নিচ্ছি। আমিই শান্তি। এক ভারত, উত্তম ভারত। এক বিশ্ব, এক পরিবার।